Breaking News

তাবিজ-কবচ ব্যবহার করা কি জায়েজ? দলিল সহ মাসালা tabiz sirik




প্রশ্ন : রোগমুক্তির জন্য যেকোনো প্রকার তাবিজ শরীরে পরা বা বাঁধা জায়েজ আছে কি?

উত্তর : এ ক্ষেত্রে দুটি বিষয় উল্লেখ্য। তা হচ্ছে, যেকোনো ধরনের তাবিজ তো মোটেই নয়, বরং কোরআনের আয়াত লেখা তাবিজও ব্যবহার করা যাবে না। রাসূল (সা.) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি তাবিজ ঝোলাল, সে ব্যক্তি কুফরি করল এবং শিরক করল।’

তাবিজ-কবচ যেগুলো লেখা হয়, যাতে কুফরি কালাম থাকে, সেগুলো তো কোনো মুমিন ব্যক্তি পরতে পারবে না। তবে কোরআনুল কারিমের আয়াত লেখা কোনো তাবিজ কেউ পরতে পারবে কি না, এ ব্যাপারে আলেমদের দুই মত। একটি হচ্ছে যে, এভাবে কোনো তাবিজ-কবচ ব্যবহার করা যাবে না। কারণ হিসেবে তাঁরা বলেছেন, এটা দ্বারা পথ বন্ধ করে দেওয়া হয়। আমার হাতে কোরআনের আয়াত লেখা তাবিজ থাকবে, আরেকজনের হাতে থাকবে কুফরি কালাম লেখা তাবিজ।

আরেকটি বিষয় হলো, কোরআনের আয়াত লেখা তাবিজ নিয়ে তো টয়লেটে যাওয়া হতে পারে। সে ক্ষেত্রে কোরআনের সম্মানহানি হবে। এ জন্য বলা হয়েছে যে, কোরআন লিখেও তাবিজ করে হাতে বাঁধা জায়েজ নেই।

বরং কোরআন পড়ে কোনো পানির মধ্যে বা তেলের মধ্যে ফু দিয়ে দম করে সেটা ব্যবহার করা যেতে পারে। সুতরাং আপনি যেটা বলেছেন, এভাবে তাবিজ-কবচ পরা, এগুলো জায়েজ নেই, এমনকি কোরআনের আয়াত হলেও জায়েজ নেই। এটা থেকে যেন আমরা বিরত থাকতে পারি, আল্লাহতায়ালা আমাদের সে তৌফিক দান করুন।



তাবিজ ব্যাবহার করা শির্ক? জায়েজ ? তার দলিল

উকবা বিন আমের আল-জোহানি রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু বলেন,

একদা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু
‘আলাইহি ওয়াসাল্লামের
দরবারে একদল লোক উপস্থিত হল।
তাদের নয়জনকে তিনি বায়আত করলেন একজনকে করলেন না।
তারা বলল, হে আল্লাহর রাসূল! নয়জনকে বায়আত করলেন, আর তাকে ত্যাগ করলেন? তিনি বললেন:
‏« ﺇِﻥَّ ﻋَﻠَﻴْﻪِ ﺗَﻤِﻴﻤَﺔً ” ، ﻓَﺄَﺩْﺧَﻞَ ﻳَﺪَﻩُ ﻓَﻘَﻄَﻌَﻬَﺎ، ﻓَﺒَﺎﻳَﻌَﻪُ،
ﻭَﻗَﺎﻝَ : ” ﻣَﻦْ ﻋَﻠَّﻖَ ﺗَﻤِﻴﻤَﺔً ﻓَﻘَﺪْ ﺃَﺷْﺮَﻙَ ‏»
“তার উপর তাবিজ রয়েছে,
তিনি স্বীয় হাত বের করে তা ছিঁড়ে ফেললেন, অতঃপর তাকে বায়আত করলেন, এবং বললেন যে তাবিজ ঝুলালো সে শিরক করল।[5]
একদা হুযায়ফা রাদিয়াল্লাহু
‘আনহু জনৈক ব্যক্তির হাতে জ্বরের তাগা দেখে কেটে ফেললেন। অতঃপর তিনি তিলাওয়াত করেন:
﴿ ﻭَﻣَﺎ ﻳُﺆۡﻣِﻦُ ﺃَﻛۡﺜَﺮُﻫُﻢ ﺑِﭑﻟﻠَّﻪِ ﺇِﻟَّﺎ ﻭَﻫُﻢ ﻣُّﺸۡﺮِﻛُﻮﻥَ ١٠٦
﴾ ‏[ ﻳﻮﺳﻒ : ١٠٥ ‏]
“তাদের অধিকাংশ আল্লাহর
প্রতি বিশ্বাস স্থাপন করে, তবে শিরক করা অবস্থায়”। [6]
এ ঘটনা প্রমাণ করে তাগা ব্যবহার করা শিরক।

দলিলঃ [5] সহি মুসনাদে আহমদ: (১৬৯৬৯), সহি হাদিস সমগ্র : (৪৯২), হাকেম।

দ্বিতীয়ত যেসব দলিলে তাবিজের উপর নিষেধাজ্ঞা রয়েছে, তাতে কুরআন-হাদিসের তাবিজ বৈধ বলা হয়নি, যেমন শিরক মুক্ত ঝাড়-ফুঁক বৈধ বলা হয়েছে। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন,
‏« ﺍﻋْﺮِﺿُﻮﺍ ﻋَﻠَﻲَّ ﺭُﻗَﺎﻛُﻢْ ﻟَﺎ ﺑَﺄْﺱَ ﺑِﺎﻟﺮُّﻗَﻰ ﻣَﺎ ﻟَﻢْ ﻳَﻜُﻦْ
ﻓِﻴﻪِ ﺷِﺮْﻙٌ ‏»
“তোমাদের ঝাড়-ফুঁক আমার কাছে পেশ কর, ঝাড়-ফুঁকে কোনো সমস্যা নেই, যদি তাতে
শিরক না থাকে”।[12]
এ হাদিসে যেরূপ কুরআনুল কারিমের তাবিজকে পৃথকভাবে বৈধ বলা হয়নি, যেমন শিরক মুক্ত ঝাড়-ফুককে বৈধ বলা হয়েছে। নবী সাল্লাল্লাহু
‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম ও তার সাহাবিদের জীবনে
তাবিজের কোনো প্রমাণ নেই।
হাদিসের পাঠকমাত্র দেখবে,
দোয়া ও যিকর সংক্রান্ত সকল হাদিসের ভাষা হচ্ছে, ‘যে ইহা বলবে’, অথবা ‘যে ইহা পড়বে’
ইত্যাদি; একটি হাদিসেও নেই
‘যে ইহা লিখে রাখবে’, অথবা ‘যে ইহা ঝুলাবে’। ইবনে আরাবি বলেন: “কুরআন ঝুলানো সুন্নত নয়,
কুরআন পাঠ করা সুন্নত”।
ইব্রাহিম নখয়ি রহ. বলেন, “আব্দুল্লাহ বিন মাসউদের সাথীগণ কুরআন ও গায়রে কুরআন সর্বপ্রকার তাবিজ অপছন্দ করতেন,
যেমন আলকামা, আসওয়াদ, আবু ওয়ায়েল, মাসরুক ও রাবি বিন খায়সাম প্রমুখ তাবেয়িগণ”। [13]
শিরক ও পাপের পথ বন্ধ করার স্বার্থে সকল তাবিজের উপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা জরুরি। কুরআনের তাবিজ শিরকী তাবিজের পথ উন্মুক্ত করে। আদর্শ মনীষীগণ তাবিজ অপছন্দ করতেন, অথচ তাদের যুগ ছিল বিদআত ও শিরক মুক্ত, ওহী ও ঈমানের নিকটবর্তী। আমাদের যুগ মূর্খতা ও বিদআত সয়লাবের যুগ, এতে তাবিজ বৈধ বলার অর্থ উম্মতকে শিরকের দিকে ঢেলে দেওয়া।
দ্বিতীয়ত তাবিজে ব্যবহৃত কুরআন নাপাক বস্তু বা স্থানের সম্মুখীন হয়, বিশেষত বাচ্চাদের গলার তাবিজ, যা থেকে কুরআনকে পবিত্র রাখা জরুরি।
তাবিজ ব্যবহারকারীরা সাধারণত কুরআন-হাদিসের
ঝাড়-ফুঁক করে না, তাবিজকেই
যথেষ্ট ভাবে। তাদের অন্তর
তাবিজের সাথে ঝুলন্ত থাকে,
যদিও তারা স্বীকার করে না,
তবে তাবিজ খুললে তার সত্যতা
প্রকাশ পায়! কারো চেহারা
বিবর্ণ হয়, কারো শরীরে
কাঁপুনি উঠে। যদি তাদের অন্তর
আল্লাহর সাথে সম্পৃক্ত থাকত ও তাতে পূর্ণ বিশ্বাসী হত, কখনো
তারা মন এমন বস্তুর দিকে
ধাবিত হত না, যার সম্পর্ক কুরআন-
হাদিসের সাথে নেই। বস্তুত তাবিজ ব্যবহার করে তারা কুরআনের সাথে নয়, বরং কাগজ ও
জড় বস্তুর সাথে সম্পৃক্ত হয়।
তাবিজ একটি জড়-বস্তু, তার
সাথে রোগ-মুক্তির কোনো
সম্পর্ক নেই। তাবিজকে রোগ মুক্তির উপায় সাব্যস্ত করার জন্য
অবশ্যই দলিল প্রয়োজন, তার পক্ষে
কোনো শরীয় দলিল নেই।
কারো রোগ-ব্যাধি হলে শরয়ী ঝাড়-ফুঁক করা সুন্নত, যেমন
জিবরীল ‘আলাইহিস সালাম
নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লামকে করেছেন, নবী
সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার সাহাবীদের
করেছেন। এটাই বৈধ ও শরীয়ত অনুমোদিত পন্থা।
বৈধ ঝাড়-ফুঁকের বিনিময় গ্রহণ
করা বৈধ, যদি তার দ্বারা
আরোগ্য লাভ হয় এবং সুন্নত
মোতাবেক ঝাড়-ফুঁক করা হয়;
যেমন নবী সাল্লাল্লাহু
‘আলাইহি ওয়াসাল্লামের
সাহাবীগণ বিনিময় গ্রহণ
করেছেন, কিন্তু আমাদের সমাজের একশ্রেণীর আলেম
তাবিজ দেন ও আরোগ্য লাভের পূর্বে বিনিময় গ্রহণ করেন।
তারাও দলিল হিসেবে বুখারি শরীফের হাদিসটি পেশ করেন,
অথচ সেখানে স্পষ্ট আছে
সাহাবিগণ তাবিজ দেননি,
বরং সূরা ফাতিহা পাঠ
করেছেন এবং আরোগ্য লাভ
করার পর বিনিময় গ্রহণ করেছেন,
আগে নয়। অতএব এ হাদিসকে
তাবিজ দেয়া ও তার বিনিময়
গ্রহণ করার দলিল হিসেবে পেশ
করা অপব্যাখ্যা ব্যতীত কিছু নয়।
========================

[6] ইউসুফ: (১০৬) তাফসিরে ইবনে কাসির।

[3] তামিমার সংজ্ঞা: রোগ-ব্যাধি থেকে আরোগ্য লাভ অথবা বদ-নজর প্রতিরোধ অথবা সম্ভাব্য কোনো অনিষ্ট দূর করার জন্য শরীরে ঝুলানো বস্তুকে তামিমাহ বলা হয়, হোক সেটা কড়ি, অথবা লাকড়ি, অথবা তাগা, অথবা কাগজ কিংবা কোনো বস্তু। ইসলাম পূর্বযুগে বদ-নজর থেকে সুরক্ষা এবং গৃহ-পালিত পশু-পাখী ও দুষ্ট প্রাণীকে বশ করার জন্য, কখনো আত্মরক্ষার জন্য মুশরিকরা তামিমাহ গলায় বা শরীরের কোনো অংশে ঝুলাত। তাদের বিশ্বাস ছিল, তাকদির প্রতিরোধ ও অনাগত অনিষ্ট দূর করার ক্ষমতা রাখে তামিমাহ।
তারা কখনো তামিমাহ দ্বারা গায়রুল্লাহর আশ্রয় প্রার্থনা করত, যা ছিল সরাসরি শিরক ও তাওহীদ পরিপন্থী। ইসলাম তার উপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে।


No comments