History of the Emergence of Independent Bangladesh
স্বাধীন বাংলাদেশের অভ্যুদয়ের ইতিহাস
অধ্যায় 1
অতি সংক্ষিপ্ত প্রশ্নাবলী
বাংলাদেশের বৃহত্তম পাহাড় ও উচ্চতম বা সর্বোচ্চ পর্বত শৃঙ্গ কোনটি?
*উত্তরঃ 1.গারো পাহাড়/
2.তাজিংডং (বিজয় নামেও পরিচিত .পর্বতের উচ্চতা ১,২৮০ মিটার
বাংলার জনপদ গুলোর নাম লিখ?
উত্তরঃ এটির আসল উত্তর ছিল: প্রাচিন বাংলার কয়েকটি জনপদের নাম লিখ? পুন্ড্র,সমতট,চন্দ্রদ্বীপ,রাঢ়,হরিকেল,বঙ্গ ইত্যাদি। ... মহাভারত, পুরাণ, হরিবংশ ইত্যাদি অনুযায়ী প্রাচীন কালে একজন রাজা ছিলেন যার নাম বলী রাজা।
বাংলা সাহিত্যের প্রাচীন নিদর্শন কোনটি ?
উত্তরঃ
বাংলা ভাষায় রচিত সাহিত্যের আদিতম নিদর্শন হল চর্যাপদ। খ্রিষ্টীয় দশম থেকে দ্বাদশ শতাব্দীর মধ্যবর্তী সময়ে রচিত চর্যা পদাবলি ছিল সহজিয়া বৌদ্ধ সিদ্ধাচার্যদের সাধনসংগীত। আধুনিক ভাষাতাত্ত্বিকগণ বৈজ্ঞানিক তথ্যপ্রমাণের সাহায্যে প্রমাণ করেছেন যে চর্যার ভাষা প্রকৃতপক্ষে হাজার বছর আগের বাংলা ভাষা।
সংক্ষিপ্ত প্রশ্নাবলী
বাংলা নামের উৎপত্তি সম্পর্কে টীকা লিখঃ
উত্তরঃ
বাংলা নামের উৎপত্তি সম্পর্কে টীকা লিখ। ... বঙ্গ একটি প্রাচীন নাম। ঐতরেয় অরণ্যক' নামক গ্রন্থে সর্বপ্রথম বঙ্গের উল্লেখ পাওয়া যায় । বঙ্গের উৎপত্তি নিয়ে ঐতিহাসিক গোলাম হোসেন সেলিম বলেন যে, হযরত নূহ (আঃ)- এর পুত্র হিন্দ এর পুত্র বঙ্গ থেকে বাঙালি জাতির উৎপত্তি (রিয়াজ উস সালাতিন)।
অথবা:
বাংলা মাত্র তিন বর্ণের একটি শব্দ। কিন্তু এটি একটি ইতিহাস। প্রাচীনকালে সমগ্র বাংলাদেশের বিশিষ্ট কোন নাম ছিল না। এর এক একটি অংশ এক এক ভিন্ন নামে পরিচিত ছিল। বাংলা নামের উৎপত্তিতে রয়েছে অনেক চড়াই উতরাই। বৈদিক যুগের আর্যগণ বাংলার সাথে পরিচিত ছিল না এবং তাদের গ্রন্থ ‘ঋক সংহিতায়' এরূপ কোন নামের উল্লেখ
নেই। সর্বপ্রথম বঙ্গ নামের উল্লেখ দেখা যায় ঐতরেয় আরণ্যকে। এতে বঙ্গকলিঙ্গ জনপদের প্রতিবেশী বলে এর অধিবাসীদের সম্পর্কে নানা প্রকার ‘অশ্রদ্ধাসূচক' মন্তব্য রয়েছে। বৈদিক যুগের শেষ ভাগে রচিত কতগুলো গ্রন্থ হতে জানা যায় যে, বাংলাদেশে-মগধ, চের ও বঙ্গ এই তিনটি অঞ্চল ছিল। রামায়ণ ও মহাভারতে একাধিকবার বঙ্গ নামের উল্লেখ আছে। এই দুই মহাকাব্যে পুন্ড্র (উত্তরবঙ্গ) বঙ্গ (দক্ষিণ ও পূর্ববঙ্গ) সূক্ষ্ম (পশ্চিমবঙ্গ) তাম্রলিপিসহ প্রভৃতিতে এর উল্লেখ পাওয়া যায়। জৈনসূত্র আচারঙ্গ গ্রন্থ হতে জানা যায় যে, পুন্ড্র বা রাঢ় দেশ তখন সূক্ষ্মভূমি ও বজ্রভূমি নামে দুইভাগে বিভক্ত ছিল। প্রাচীন বৌদ্ধ সাহিত্য ও বঙ্গ ও সূক্ষ্ম এই দুটি অঞ্চলের উল্লেখ দেখতে পাওয়া যায়। অঙ্গুত্তবণি বৌদ্ধজাতক ও দিব্যাবদনের বঙ্গ, রাঢ় ও পুন্ড্রবর্ধনের উল্লেখ আছে। মিলিন্দ পঞ্চহে গ্রন্থে বঙ্গকে একটি সামুদ্রিক বন্দর বলা হয়েছে। গ্রীক লেখকদের রচনায় বঙ্গ নামের কোন শব্দের উল্লেখ নেই। তেমনি মৌর্য যুগ ও অন্যান্য রাজবংশের শাসনামলে উৎকীর্ণ শিলালিপিতে বাংলার উল্লেখ পাওয়া যায় না। গুপ্তযুগের শিলালিপি ও কালিদাসের রচনায় বঙ্গের উল্লেখ থাকলেও এর সীমারেখা সম্পর্কে তেমন কিছু বলা হয়নি। বর্তমানে যে ভূখন্ড নিয়ে বাংলাদেশ গঠিত; পূর্বে এর অধিকাংশ অংশ ‘বঙ্গ' নামে পরিচিত ছিল। এটি অতি প্রাচীনকাল হতে বিদ্যমান ছিল। তখন ইহা কতকগুলি খন্ডরাজ্যে বিভক্ত ছিল। পশ্চিমবঙ্গেতখন রাঢ় ও তাম্রলিপ্ত; বাংলাদেশে তখন বঙ্গ সমতট হরিকেল এবং উত্তরবঙ্গে পুন্ড্র ও বরেন্দ্র এই কয়টি পৃথক রাজ্য ছিল। প্রাচীন বাংলার জনপদের সীমানা নির্ধারণ সম্ভব নয়। কারণ, রাজশক্তির হ্রাসবৃদ্ধিরসঙ্গে সঙ্গে ইহার সীমানাও পরিবর্তিত হয়েছে। গুপ্ত সাম্রাজ্যেরপতনের পর শশাঙ্ক গৌড়ে একটি স্বাধীন রাজ্য স্থাপন করেন। বর্তমান উত্তরবঙ্গ ও পশ্চিমবঙ্গ নিয়ে ইহা গঠিত ছিল। বঙ্গেশ্বর বলে দাবি করেননি বরং গৌড়েশ্বর বলেই পরিচিত ছিলেন। তখন তিনি কখনও বঙ্গ ও হরিকেল তাঁর শাসনাধীন বলে মনে হয় না। অবশ্য সে সময় হতে গৌড় বলতে ব্যাপকভাবে বাংলাদেশকে বুঝানো হতো। পাল ও সেন যুগে যুগে গৌড়ের রাজ্যসীমা অনেকদূর বিস্তার লাভ করেছিলো। তাই কাশ্মীরের ঐতিহাসিক কহলন তাঁর ‘রজতবঙ্গিনী' গ্রন্থে গৌড়ের উল্লেখ করেছিলেন। শাসনতান্ত্রিক দিক হতে বাংলাদেশ তখন পুন্ড্রবর্ধনভুক্তি, বর্ধমানভুক্তি, কঙ্গগ্রামভুক্তি প্রভৃতি নামে পরিচিত ছিল। ত্রয়োদশ শতাব্দীতে বখতিয়ার খল্জী তখন লক্ষ্মণ সেনের নিকট হতে নদীয়া ও লাখনৌতি দখল করেন। তখন বাংলাদেশ রাঢ়, বাগড়ী, বঙ্গ, বরেন্দ্র ও মিথিলা এ পাঁচটি খন্ডে ভাগ ছিল। মুসলমানগণ গৌড় দখল করলেও রাঢ় ও বরেন্দ্র ব্যতীত বাকি অঞ্চলে বহুদিন ধরে হিন্দুশাসন বিদ্যমান ছিল। বখতিয়ার খল্জী লাখনৌতি দখলের পর হতে দিল্লীর সুলতানদের নিকট এই অঞ্চল লাখনৌতি বা গৌড় বলে পরিচিত ছিল। এখানে ঘন ঘন গোলযোগ দেখা দিত বলে তাঁরা একে ‘বুলঘকপুর' বা বিদ্রোহী নগরী বলে অভিহিত করতেন। দীর্ঘদিন ধরে বাংলার বিদ্রোহী শাসকদের সঙ্গে যুদ্ধবিগ্রহ করে দিল্লীর সুলতান গিয়াসউদ্দীন তুঘলক একে লক্ষ্মণাবতী, সাতগাঁও ও সোনাগাঁও-এই তিনটি ভাগে বিভক্ত করেন এবং প্রতিটির জন্য আলাদা আলাদা শাসনকর্তা নিযুক্ত করেন। কিন্তু এ নাম ও বিভাগ স্থায়ী হয়নি। স্বাধীন সুলতানদের উত্থানের সঙ্গে সঙ্গে আবার গৌড়কে কেন্দ্র করে বিরাট সাম্রাজ্য গড়ে ওঠেছিল। সমসাময়িককালেরদিল্লী সাম্রাজ্যেরতুলনায় গৌড় অনেক বৃহৎ সাম্রাজ্য ছিল। বাংলা নামটি মুঘল যুগেই সর্বপ্রথম দেশবাচক নাম হিসেবে ব্যবহৃত হয়। সম্রাট আকবরের রাজমহল দখলের পর হতে ইহা একটি সুবার মর্যাদা লাভ করে এবং মুঘল দলিলপত্রে এর নামকরণ হয় ‘সুবে বাঙালা'। মুঘল ঐতিহাসিক আবুল ফজল তাঁর ‘আইন-ই-আকবরী' গ্রন্থে এই নামের উৎপত্তি সম্পর্কে একটি অদ্ভুত কাহিনী লিপিবদ্ধ করেছেন। আবুল ফজলের মতে ‘বাংলাদেশের অতি প্রাচীন নাম হইল বাং বা বাঙ্গ। এই বঙ্গে পুবাকালের শাসকেরা স্থানে স্থানে টিপি বা জাঙ্গাল নির্মাণ করিত। এই টিপি দশ হাত উঁচু ও বিশ হাত প্রশস্ত হইত। সম্ভবতঃ বহিরাক্রমণ হইতে দেশকে সুরক্ষিত করিবার জন্য বিশেষ বিশেষ স্থানে মৃত্তিকা দ্বারা ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র পাহাড়ের ন্যায় দুর্গ-প্রাচীর প্রস্তুত করা হইত। ‘আল' বা ‘আলি' শব্দের অর্থ বাঁধ। এই সমস্ত বাঁধের পার্শ্বস্থ খাল বা নালায় মানুষ যাতায়াতের জন্য ‘সাঁকো' নির্মিত হইত। যেইযেতু ‘বাঙ্গ' ও আল এই কথা দুইটির সংমিশ্রণে (বঙ্গ + আল + বাঙ্গাল) ক্রমে ক্রমে ‘বাঙ্গালা' নামের উৎপত্তি হইয়াছে'। তবে আধুনিককালের ঐতিহাসিকগণ আবুল ফজলের উক্তির সাথে একমত নন। ড. রমেশ চন্দ্র মজুমদার লিখেছেন, ‘খ্রিস্টীয় অষ্টম শতাব্দী সম্ভবত আরও প্রাচীনকাল হইতেই ‘বঙ্গ' বা ‘বাঙ্গাল' দুইটি পৃথক দেশ ছিল এবং অনেক প্রাচীন লিপি ও গ্রন্থে এই দুইটি দেশের একত্র উল্লেখ দেখিতে পাওয়া যায়। সুতরাং বঙ্গ দেশের নাম হইতে আল যোগে অথবা অন্য কোন কারণে বঙ্গাল অথবা বাংলা নামের উদ্ভব হইয়াছে ইহা স্বীকার করা যায় না। বঙ্গাল দেশের নাম হইতেই কালক্রমে সমগ্র দেশের বাংলা নামকরণ করা হইয়াছে, এ বিষয়ে কোন সন্দেহ নাই।' যাই হোক না কেন মুঘল আমল হতে বাঙ্গালা নামটি প্রতিষ্ঠা লাভ করে। নওয়াবী আমলে এটি ছিল দেশবাচক নাম। ইংরেজরা এ দেশকে বেঙ্গল ও বেঙ্গলা নামে অভিহিত করে। তারপর হতে ষোড়শ, সপ্তদশ ও অষ্টাদশ শতাব্দীতে পাশ্চাত্যদেশীয়বণিকগণ কাগজপত্রে এই নামটিই ব্যবহার করতো। আধুনিককালের সাধু বাংলায় লেখা হতো বাঙ্গালা। এরপর হতে বাঙলা, বঙ্গদেশ বা বাঙলাদেশ (বাংলাদেশ) প্রভৃতি নাম ব্যবহৃত হতে থাকে। মানিক রাজার গানে ‘ভাটী' ও ‘বাঙ্গাল' উভয় শব্দই ব্যবহৃত হতো। কবি কঙ্কন বাঙ্গাল শব্দ ব্যবহার করেছিলেন। কালক্রমে তা বাংলা থেকে বাংলাদেশ হিসেবে ব্যবহৃত হতে থাকে। আলী আকবর, শিক্ষার্থী, ঢাকা কলেজ, বাংলাভাষা ও সাহিত্য
TAGS:
বাঙালি জাতির নৃতাত্ত্বিক পরিচয় দাও?
উত্তরঃ
আদি-অস্ট্রালদের সঙ্গে ভূমধ্য নরগােষ্ঠী বা দ্রাবিড়দের মিলনের ফলেই তৈরি হয়েছিল বাঙালির নৃতাত্ত্বিক বনিয়াদ। তবে উচ্চশ্রেণির বাঙালিরা ছিল আলপীয় গােষ্ঠীভুক্ত। 'আমঞ্জুশ্রীমূলকল্প' নামক প্রাচীন বৌদ্ধগ্রন্থে বলা হয়েছে যে, বাংলা দেশের আর্যভাষাভাষী লােকেরা 'অসুর জাতিভুক্ত।
সংস্কৃতি সমন্বয়বাদিতাবলতে কি বুঝ?
উত্তনঃ
সংস্কৃতির সমন্বয়বাদিতা কী: বিভিন্ন সংস্কৃতির সঙ্গে খাপ - খাইয়ে চলাই হলাে সংস্কৃতির সমন্বয়বাদিতা । প্রত্যেক জাতির মধ্যে সংস্কৃতির ভিন্নতা লক্ষ করা যায় । মুসলিম সংস্কৃতি হিন্দু সংস্কৃতি থেকে পৃথক । প্রভু - ভূত , চোর - ডাকাতের সংস্কৃতির মধ্যেও ভিন্নতা রয়েছে ।
রচনামূলক প্রশ্নাবলী
বাংলাদেশের ভূ-প্রকৃতির বৈশিষ্ট্য আলোচনাকরো?
উত্তরঃ ভূমিকা : পৃথিবীর মানচিত্রে ছােট একটি স্থান দখল করে আছে তার নাম বাংলাদেশ। বাংলাদেশের অবস্থান এশিয়া মহাদেশের দক্ষিণে । ভৌগােলিক অবস্থান আর ভূ-প্রকৃতিতে রয়েছে এক নিজস্ব স্বকীয় সত্তা। এ সুন্দর সবুজ শ্যামলা বাংলাদেশের ভৌগােলিক অবস্থার পুরােপুরি নিয়ন্ত্রণ করে তার বুকে বয়ে যাওয়া অজস্র নদী।প্রাচীনকালে বিশাল এলাকার সমষ্টিকে বাংলা নামে অভিহিত করা হতাে কিন্তু সময়ের পরিবর্তনে কালের পরিক্রমায়, নদীর পথ পরিবর্তনে এটি একটি নির্দিষ্ট সীমানা নির্ধারণ করেছে। আর এই জনপদটির ভূ-প্রকৃতিও অনেক বৈচিত্র্যময়। পদ্মা, মেঘনা, যমুনা, ব্রহ্মপুত্র প্রভৃতি অসংখ্য নদ-নদী এ দেশের উপর দিয়ে বয়ে গেছে। যা এ দেশকে করেছে সৌন্দর্যের এক অপরূপ লিলা ভূমি । নিচে বাংলাদেশের অবস্থান ও ভূ-প্রকৃতির বৈশিষ্ট্য আলােচনা করার প্রয়াস চালানাে হলাে।
বাংলাদেশের অবস্থান ও ভূ-প্রকৃতির বৈশিষ্ট্য
বাংলাদেশের ভৌগােলিক অবস্থান
বাংলাদেশ এশিয়া মহাদেশের দক্ষিণে অবস্থিত।২০°৩৪’ উত্তর অক্ষরেখা থেকে ২৬°৩৮° উত্তর অক্ষাংশ এবং ৮৮°০১ থেকে ৯২°৪২’ পূর্ব দ্রাঘিমাংশ পর্যন্ত বাংলাদেশের বিস্তৃতি। বাংলাদেশের মধ্যভাগ। দিয়ে অতিক্রম করেছে কর্কটক্রান্তি রেখা বাংলাদেশ তিন দিকে স্থল এবং একদিকে জল দ্বারা বেষ্টিত। এর উত্তরে ভারতের পশ্চিম বঙ্গ, মেঘালয় ও আসাম। পূর্বে ভারতের আসাম, ত্রিপুরা রাজ্য ও মিজোরাম এবং মিয়ানমার, দক্ষিণে বঙ্গোপসাগর এবং পশ্চিমে ভারতের পশ্চিম বঙ্গ ।
আরো পড়তে পারেন:বাঙালি জাতির নৃ-গােষ্ঠীর পরিচয় সম্পর্কে মনীষীদের দৃষ্টিভঙ্গি সংক্ষেপে লিখ।
বাংলাদেশের আয়তন: বাংলাদেশের মােট আয়তনের মধ্যে নদ-নদী অঞ্চলের আয়তন প্রায় ৯৩৮০ বর্গ কিলােমিটার। বনাঞ্চলের আয়তন ২২,৫৮৪ বর্গ কিলােমিটার। বাংলাদেশের মােট আয়তন ১,৪৭,৫৭০ বর্গ কিলােমিটার। বাংলাদেশের সমুদ্রসীমা ১২ নটিক্যাল মাইল এবং অর্থনৈতিক সমুদ্রসীমা ২০০ নটিক্যাল মাইল ।
বাংলাদেশের সীমারেখা : বাংলাদেশের সর্বমােট সীমারেখা ৫১৩৮ কি.মি। এর মধ্যে বাংলাদেশ ভারত সীমারেখার দৈর্ঘ্য ৪১৪৪ কিলােমিটার। বাংলাদেশ মিয়ানমার সীমারেখা দৈর্ঘ্য ২৮৩ কিলােমিটার এবং বাংলাদেশের সমুদ্রসীমা ৭১১ কিলােমিটার।
প্রান্তীয় অবস্থান ও সমুদ্র হতে দূরত্ব এবং সমুদ্রের অবস্থান অনুসারে বিভিন্ন দেশের অবস্থান মহাদেশীয় প্রান্তীয়, উপদ্বীপীয় হয়ে থাকে। বাংলাদেশের অবস্থান প্রান্তীয় । এরূপ অবস্থানের জন্য এর দক্ষিণে ভগ্ন উপকূলে সমুদ্র বন্দর গড়ে উঠেছে। এ কারণে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের সাথে সুলভ জলপথে বাংলাদেশের ব্যবসা বাণিজ্যে গড়ে ওঠেছে।
ভূ-প্রকৃতির বৈশিষ্ট্য ও বিশ্বের যতগুলাে ব-দ্বীপ রয়েছে এর মধ্যে অন্যতম প্রধান হলাে বাংলাদেশ অর্থাৎ বাংলাদেশ পৃথিবীর একক বৃহত্তম ব-দ্বীপ। পদ্মা, মেঘনা, ও যমুনা নদী পশ্চিম-উত্তর ও উত্তর-পূর্ব দিক থেকে দেশের অভ্যন্তরে প্রবেশ করে একযােগে এ সুবিশাল ব-দ্বীপের সৃষ্টি করেছে। সীমিত উচ্চভূমি ছাড়া সমগ্র দেশ বিস্তীর্ণ সমভূমি এদেশের ভূ-খণ্ড উত্তর-পশ্চিম থেকে দক্ষিণ-পূর্ব দিকে ক্রমশ ঢালু। ফলে প্রবাহিত সব নদ-নদী এবং উপনদী-শাখা নদীগুলাে উত্তরদিক হতে দক্ষিণে বঙ্গোপসাগর অভিমুখে প্রবাহিত হয়েছে।
ভূমির পার্থক্য ও গঠনের দিক বিবেচনা করে বাংলাদেশের ভূ-প্রকৃতিকে তিনটি প্রধান ভাগে ভাগ করা যায় ।
১. টারশিয়ারি যুগের পাহাড়সমূহ;
২. প্লাইস্টোসিনকালের সােপানসমূহ বা চত্বরভূমি;
৩. সাম্প্রতিক কালের প্লাবন সমভূমি।
নিম্নে এগুলাের আলােচনা করা হলাে-
১. টারশিয়ারি যুগের পাহাড়সমূহ : রাঙ্গামাটি, বান্দারবন, খাগড়াছড়ি, চট্টগ্রাম, সিলেট, মৌলভীবাজার ও হবিগঞ্জ এলাকাগুলাে নিয়ে এ অঞ্চল গঠিত। আনুমানিক টারশিরারি যুগে হিমালয় পর্বত উঠিত হওয়ার সময় মায়ানমারের দিক থেকে আগত গিরিজনি আলােড়নের ধাক্কায় ভাজগ্রস্ত হয়ে এসব পর্বতের সৃষ্টি হয়েছে। তাই এদের টারশিয়ারি পাহাড় বলা হয় ।
আরো পড়তে পারেন:বাংলাদেশের জনগোষ্ঠির নৃ-তাত্ত্বিক পটভূমি আলােচনা কর।
এ পাহাড়গুলাের বৈশিষ্ট্য হলো বেলে পাথর, স্ট্রেট জাতীয় প্রস্তর এবং কর্দমের সংমিশ্রণে গঠিত। পাহাড়গুলাের গায়ে ক্ষুদ্র বৃহৎ বৃক্ষরাজির বন এবং অসংখ্য ঝােপ জঙ্গল রয়েছে। তাই সংক্ষেপে বলা যায় যে, টারশিয়ারি যুগের হিমালয় পর্বত গঠনের সময় পাহাড় সৃষ্টি হয়েছিল বলে এগুলােকে টারশিয়ারি পাহাড় বলে ।
এ পাহাড়ি অঞ্চলকে দু’ভাগে ভাগ করা যায়। যথা-
(ক) উত্তর ও উত্তর পূর্বাঞ্চলের পাহাড়সমূহ,
(খ) দক্ষিণ পূর্বাঞ্চলের পাহাড়সমূহ।
(ক) উত্তর ও উত্তর পূর্বাঞ্চলের পাহাড়সমূহ : ময়মনসিংহ ও নেত্রকোনাে জেলার উত্তরাংশ, সিলেট জেলার উত্তর ও উত্তর পূর্বাংশ এবং মৌলভীবাজার ও হবিগঞ্জের দক্ষিণাংশের ছােট বড় বিচ্ছিন্ন পাহাড়গুলাে এ অঞ্চলের অন্তর্গত। মৌলভীবাজার, হবিগঞ্জের দক্ষিণে পাহাড়গুলাের উচ্চতা ২৪৪ মিটারের বেশি না। শেরপুর ও ময়মনসিংহের উত্তর সীমানায়ে কিছু কিছু পাহাড় আছে। উত্তরের পাহাড়গুলাের মধ্যে চিকনাগুল খাসিয়া ও জয়ন্তিয়া উল্লেখযােগ্য। সিলেট জেলার পাহাড়ি অঞ্চল সিলেট শহরের উত্তরপূর্ব দিকে ১৮৬ বর্গকিলােমিটার জুড়ে বিস্তৃত। এ পার্বত্য ভূমির উচ্চতা ৬০
থেকে ১০০ মিটারের বেশি নয়।সুনামগঞ্জ জেলার ছাতক শহরের, উত্তরে প্রায় ৪০ বর্গকিলােমিটার স্থান নিয়ে একটি টিলা পাহাড় অবস্থিত। এটি ছাতক পাহাড় নামে পরিচিত। এ পার্বত্য ভূমির গড় উচ্চতা ৪০-৬০ মিটার মৌলভাবাজার ও হবিগঞ্জ জেলার দক্ষিণ সীমানায় অবস্থিত পাহাড়গুলাে কোনােরূপ গিরি শ্রেণি গঠন করেনি।
এসব পাহাড়ের ডালগুলাে খাড়া এবং উপরিভাগ অসমান। এদেরকে ত্রিপুরার পাহাড় বলা হয়। শেরপুর ও ময়মনসিংহ জেলার উঞ্চর সীমানায় ভারতের মেঘালয় রাজ্যের গারাে পাহাড়ের সামান্য বিচ্ছিন্ন অংশ দেখা যায়। এ পার্বত্য অঞ্চলে প্রচুর বৃষ্টিপাত হয়। তাই এখানকার পাহাড়ের ঢালে প্রচুর চা উৎপন্ন হয়। বাংলাদেশের অধিকাংশ চা বাগান এ অঞ্চলেই অবস্থিত। এ অঞ্চলে আনারসও উৎপন্ন হয়। এছাড়া এ পার্বত্য অঞ্চলে প্রচুর বাঁশ ও বেত পাওয়া যায়। এ অঞ্চলে প্রাকৃতিক গ্যাস, খনিজ তেল, চুনাপাথর, কয়লা প্রভৃতি খনিজ সম্পদে সমৃদ্ধ।
(খ) দক্ষিণ পূর্বাঞ্চলের পাহাড়সমূহ : খাগড়াছড়ি, রাঙ্গামাটি ও বান্দরবান জেলায় এবং চট্টগ্রামের অংশ বিশেষ এ অঞ্চলের অন্তর্গত। এ পাহাড়গুলাের গড় উচ্চতা ৬১০ মিটার। বাংলাদেশের সর্বোচ্চ শৃঙ্গ তাজিংডং (বিজয়) যার উচ্চতা ১২৩১ মিটার। এটা বান্দরবানে অবস্থিত এবং দ্বিতীয় সর্বোচ্চ শৃঙ্গ কিউক্রাডং যার উচ্চতা ১২৩০ মিটার। এটি অবস্থিত বান্দারবানের দক্ষিণ পূর্ব প্রান্তে। বান্দরবানের অপর দুটি উচ্চতর পাহাড় চূড়া হচ্ছে মােদরামুয়াল ১০০০ মিটার ও পিরামিড। এর উচ্চতা ৯১৫ মিটার। এসব পাহাড় বেলে পাথর, শেল ও কর্ম শিলা দ্বারা গঠিত। এ অঞ্চলের পাহাড়গুলাের মধ্যবর্তী উপত্যকা কর্ণফুলী, সাঙ্গু, মাতামুহুরী হালদা প্রভৃতি নদী প্রবাহিত হয়েছে।
২. প্লাইস্টোসিনকালের সােপানসমূহ বা চত্বরভূমি : প্রায় ২৫,০০০ বছর পূর্বে প্লাইস্টোসিনকালের সােপানসমূহ বা চরভূমি আন্তবরফ গলা পানিতে প্লাবিত হয়ে গঠিত হয়েছিল বলে ধারণা করা হয়। এ অঞ্চলের মাটির রং লাল ও ধূসর।
নিচের প্লাইস্টোসিনকালের সােপানসমূহ বা চত্বরভূমির বর্ণনা দেওয়া হলাে :
(ক) বরেন্দ্রভূমি : বরেন্দ্র প্রাচীন বাংলার সবচেয়ে প্রাচীনতম অঞ্চল । এ বরেন্দ্রভূমি রাজশাহী বিভাগের প্রায় ৯৩২০ বর্গকিলােমিটার এলাকা জুড়ে আছে। প্লাবন সমভূমি থেকে এর উচ্চতা ৬ থেকে ১২ মিটার। বঙ্গ অববাহিকায় এটি সর্ববৃহৎ প্লাইস্টোসিন যুগের উচ্চভূমি । এ এলাকার ভূমি অসমতল এবং মাটি লাল ও কাঁকরময়। এটি পশ্চিমে মহানন্দা ও পূর্বে করতােয়া নদী দ্বারা বেষ্টিত। গভীর খাতবিশিষ্ট আঁকাবাকা ছােট ছােট কয়েকটি স্রোতস্বিনী এ অঞ্চলে রয়েছে। এসব
স্রোতস্বিনী খাড়ি নামে পরিচিত। বরেন্দ্র পূর্ণ অঞ্চল পুনর্ভবা, আত্রাই ও যমুনা নদী দ্বারা চারটি অংশে বিভক্ত। এর পূর্বদিকের তিনটি অংশ বাংলাদেশের অন্তর্গত। মহানন্দা ও পুনর্ভর মধ্যবর্তী অপর অংশটি ভারতের পশ্চিম বঙ্গের অন্ত-গত। বরেন্দ্র অঞ্চল কৃষিকার্যের জন্য উপযােগী। ধান এখানকার প্রধান কৃষিজ ফসল। এছাড়াও যেসব কৃষি পণ্য এখানে উৎপন্ন হয় তাদের মধ্যে অন্যতম হলাে পাট, ভুট্টা, পান ইত্যাদি।
(খ) মধুপুর ও ভাওয়ালের গড় : উত্তরের ব্রহ্মপুত্র নদী থেকে দক্ষিণে বুড়িগঙ্গা নদী পর্যন্ত অর্থাৎ ময়মনসিংহ টাঙ্গাইল ও গাজীপুর অঞ্চল জুড়ে এর বিস্তৃতি ! এর মােট আয়তন প্রায় ৪১০৩, বর্গ কিলােমিটার। মাটি কংকর মিশ্রিত ও লাল ।
প্লাবন সমভূমি থেকে এর পূর্ব ও দক্ষিণ অংশের উচ্চতা ৬ মিটার কিন্তু পশ্চিম ও উত্তর দিকের উচ্চতা ৩০ মিটার। মধুপুর গড়ের অঞ্চলটি পাহাড়ের ক্ষয়িত অংশ বিশেষ। মধুপুর গড়কে অনেক বিশেষজ্ঞ নদী সােপান, আবার কেউ কেউ একে উথিত ব-দ্বীপও বলেন। বরেন্দ্রভূমির মতাে এখানকার মাটির রং দেখতে লাল এবং কঙ্করময় বলে কৃষি কাজের পক্ষে, বিশেষ উপযােগী নয়। এখনও ভূ-ভাগ বনজঙ্গলে পরিপূর্ণ এবং বাংলাদেশের গাজারি বৃক্ষের কেন্দ্র। মধুপুর এলাকায়
আনারস ও নানা ধরনের সবজি উৎপন্ন হয়। পানি সেচের মাধ্যমে এ অঞ্চলে কিছু ধানের চাষ হয় ।
(গ) লালমাই পাহাড় : কুমিল্লা শহর থেকে ৮ কি.মি. দক্ষিণে লালমাই থেকে ময়নামতি পর্যন্ত এটি বিস্তৃত। লালমাই পাহাড়ের আয়তন প্রায় ৩৪ বর্গ কিলােমিটার এবং গড় উ, ৩ ২১ মিটার। এর মাটি লালচে নুড়ি এবং বালি ও কংকর দ্বারা গঠিত । এ পাহাড়ের পাদদেশে আকু তরমুজ ইত্যাদি চাষ হয় ।
৩. সাম্প্রতিক কালের প্লাবন সমভুমি :বাংলাদেশের ভূ-প্রকৃতি এক অপরূপ সাজে সজ্জিত।কোথাও উঁচু,কোথাও নিচু আবার কোথাও সমান। আর এরই ধারাবাহিকতায় টারশিয়ারি যুগের পাহাড়সমূহ এবং প্লাইস্টোসিনকালের সােপান-মূহ ছাড়া সমগ্র বাংলাদেশ নদী বিধৌত এক বিস্তীর্ণ সমভূমি। অসংখ্য ছােট বড় নদী বাংলাদেশের সব জালের মতাে ছড়িয়ে আছে।সমতল ভূমির উপর দিয়ে প্রবাহিত বলে এ নদীগুলাে বন্যার সৃষ্টি করে।দেশের অধিকাংশ অঞ্চল তখন জলমগ্ন হয়। বছরের পর বছর এভাবে বন্যার সাথে পরিবাহিত পলিমাটি সঞ্চিত হয়ে পলল সমভূমি গঠিত হয়।এর আয়তন প্রায় ১,২৪,২৬৫ বর্গ কিলােমিটার।বাংলাদেশের উত্তরাংশ থেকে সাগর উপকূলের দিকে সমভূমির ঢাল ক্ৰমনিম্ন।সুন্দরবন অঞ্চল প্রায় সমুদ্র সমতলে অবস্থিত। কিন্তু সমুদ্র সমতল থেকে দিনাজপুরের উচ্চতা ৩৭৫০ মিটার,বগুড়ার উচ্চতা ২০ মিটার, ময়মনসিংহের উচ্চতা ১৮ মিটার এবং নারায়ণগঞ্জ ও যশােরের উচ্চতা ৮ মিটার। রংপুর দিনাজপুর উত্তরাংশ নােয়াখালী-কুমিল্লার পূর্বাংশ গড়াই মধুমতি অঞ্চলের পশ্চিমাংশ এবং খুলনা অঞ্চলের উত্তরাংশ দেশের অন্যান্য সমতল ভূমি থেকে অপেক্ষাকৃত উচ্চ। এসব সমভূমির বিভিন্ন স্থানে বহু নিম্নভূমি বা জলাশয় দেখতে পাওয়া যায়,এর অধিকাংশ পরিত্যক্ত অশ্বক্ষুরাকৃতি নদীখাত বা ভূপৃষ্ঠের অবনমনের জন্য সৃষ্টি হয়েছে। স্থানীয়ভাবে এগুলােকে বিল,বিল বা হাওড় বলে ।চলন বিল, মাদারীপুর বিল ও সিলেট অঞ্চলের হাওরসমূহ বর্ষার পানিতে পরিপূর্ণ হয়ে হদের আকার ধারণ করে।সমগ্র সমভূমি অঞ্চলের মৃত্তিকার স্তর খুব গভীর এবং ভূমি অতি উর্বর এবং মানুষের বসবাসের উপযােগী।তবে এ অঞ্চল সর্বত্র একই রূপ নয় বলে একে আবার কয়েকটি ভাগে ভাগ করা হয়।যেমন –
(ক) কুমিল্লা সমভূমি : চাদপুর, কুমিল্লা ও ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলার অধিকাংশ এবং লক্ষ্মীপুর নােয়াখালী, ফেনী ও হবিগঞ্জ জেলার কিছু অংশ জুড়ে এ সমভূমি অবস্থিত। কুমিল্লা সমভূমির মােট আয়তন ৭৪০৪ বর্গ কিলােমিটার এবং সমুদ্র পৃষ্ঠ হতে উচ্চতা ৩.৬ মিটার, অন্য মতে ৬ মিটার। এ সমভূমির বন্ধুরতা অনুচ্ছ এবং বর্ষাকালে প্রায় ডুবে থাকে। তবে এ অঞ্চলের ভূমি উর্বর বলে প্রচুর ধান, পাট, ও অন্যান্য ফসল জন্মে থাকে।
(খ) সিলেট অববাহিকা : সিলেট, সুনামগঞ্জ, মৌলভীবাজার ও হবিগঞ্জ জেলায় অধিকাংশ এবং কিশােরগঞ্জে ও নেত্রকোনা জেলায় পূর্বদিকের সামান্য অংশ নিয়ে এ অঞ্চল গঠিত। এটি সংলগ্ন প্লাবন সমভূমি হতে অপেক্ষাকৃত নিচু। সমুদ্র পৃষ্ঠ হতে এ অববাহিকার উচ্চতা প্রায় ৩ মিটার। এ অঞ্চল বর্ষাকালে পানিতে ডুবে যায় এবং শীতকালে পানি নেমে গেলে এখানে বােরাে ও ইরি ধানের চাষ হয়। সর্বনিম্ন স্থানগুলােতে প্রচণ্ড জলাশয়ের মতাে পানি জমে থাকে। এগুলাে হাওড় নামে পরিচিত। এ অঞ্চলের বড় ধরনের পাঁচটি হাওর রয়েছে ।
(গ) পাদদেশীয় পলল সমভূমি : বাংলাদেশের উত্তর-পশ্চিমে অবস্থিত বৃহত্তম রংপুর ও দিনাজপুর জেলার অধিকাংশ
স্থান জুড়ে এ সমভূমি বিস্তৃত। হিমালয় পর্বত থেকে আনিত পলল দ্বারাই এ অঞ্চল গঠিত। তিস্তা, আত্রাই, করতােয়া প্রভৃতি নদীবাহিত পলি জমা হয়ে এ ঢালু ভূমির সৃষ্টি হয়েছে, এ সমভূমি পাদদেশীয় পলল সমভূমি নামে পরিচিত। বর্ষাকালে এর সামান্য অংশ পানিতে প্লাবিত হয়। ধান, পাট, ইক্ষু, তামাক প্রভৃতি এ অঞ্চলে প্রচুর জন্মে।
(ঘ) গঙ্গা-ব্রহ্মপুত্র-মেঘনা প্লাবন সমভূমি : এটিই বাংলাদেশের মূল প্লাবন সমভূমি।পদ্মা নদীর উত্তরে প্লাবন সমভুমির বাকি অংশই গঙ্গা (পদ্মা), ব্রহ্মপুত্র মেঘনার প্লাবন সমভূমি নামে পরিচিত। এ প্লাবন সমভূমি বৃহত্তর ঢাকা, কুমিল্লা, ময়মনসিংহ, টাঙ্গাইল, পাবনা ও রাজশাহী অঞ্চলের অংশ বিশেষ নিয়ে বিস্তৃত। এ অঞ্চলের অধিকাংশ স্থানই বর্ষার পানিতে প্রতি বছর ডুবে যায়। নদীর দুপাড় বরাবর অনুচ্চ নদী পাড়ের প্রাকৃতিক বাঁধ পশ্চাৎঢাল অগভীর জলাভূমি বা বিল, অশ্বক্ষুরাকৃতি হ্রদ চর ইত্যাদি হচ্ছে প্লাবন সমভূমির উল্লেখযােগ্য ভূ-প্রাকৃতিক বৈশিষ্ট্য।
(ঙ) ব-দ্বীপ অঞ্চলীয় সমভূমি : বাংলাদেশের দক্ষিণ পশ্চিমের সমভূমিকে সাধারণরত ব-দ্বীপ বলা হয়। এ ব-দ্বীপ অঞ্চলটি বৃহত্তর, কুষ্টিয়া, যশাের, ফরিদপুর বরিশাল, পটুয়াখালী অঞ্চলের সমুদয় অংশ এবং রাজশাহী, পাবনা ও ঢাকা অঞ্চলের কিছু অংশ জুড়ে বিস্তৃত। এ ব-দ্বীপ অঞ্চলটি পদ্মা এবং এর শাখা নদীগুলাে দ্বারা বিধৌত। বর্তমানে পশ্চিম দিকের শাখা নদীগুলাে মৃত অবস্থায় রয়েছে এবং পূর্ব দিকের সক্রিয় নদীগুলাের মধ্যে আড়িয়াল-খা প্রধান।আঁকাবাঁকা নদীগুলাে এ অঞ্চলের অশ্বক্ষুরাকৃতি হ্রদের সৃষ্টি করেছে। ব-দ্বীপের পূর্বাংশ বর্ষাকালে প্লাবিত হয়। নদী বিল এবং দ্বীপগুলাে এ অঞ্চলের প্রধান প্রাকৃতিক বৈশিষ্ট্য। এছাড়া খুলনা থেকে ফরিদপুর ও বরিশাল পর্যন্ত বৃহৎ অথচ অগভীর একসারি গহ্বর রয়েছে।এরা ঝিল নামে পরিচিত। ব-দ্বীপ অঞ্চলীয় সমভূমিকে আবার তিনটি পৃথকভাবে ভাগ করা হয়। যেমন-
(i) সক্রিয় ব-দ্বীপ : পূর্বে মেঘনা নদীর মােহনা থেকে পশ্চিম গড়াই মধুমতি নদী পর্যন্ত বিস্তৃত ব-দ্বীপ সমভূমির পূর্বাংশকে সক্রিয় ব-দ্বীপ বলে। এর পূর্বাংশীয় অঞ্চল প্রতিবছর বর্ষাকালে প্লাবিত হয়। ধান, পাট, ইক্ষু প্রভৃতি ফসল প্রচুর পরিমাণে উৎপাদিত হয়।এ অঞ্চলের বরিশাল, পটুয়াখালী,গােপালগঞ্জ,মাদারীপুরের বিল বা হাওরগুলােতে প্রচুর মাছ পাওয়া যায় এবং শীতকালে বােরাে ও ইরি ধানের চাষ হয়।
(ii) মৃত প্রায় ব-দ্বীপ : বাংলাদেশের ব-দ্বীপ সমভূমির মধ্যে গড়াই মধুমতি নদীর পশ্চিমাংশকে মৃতপ্রায় ব-দ্বীপ বলা হয়। এটা বৃহত্তর কুষ্টিয়া ও যশাের অঞ্চলের অধিকাংশ স্থানব্যাপী বিস্তৃত। এ অঞ্চলের অধিকাংশ নদী ভরাট হয়ে মৃত প্রায় অবস্থান রয়েছে। গুচ্ছ ঋতুতে নদীগুলাে প্রায় শুকিয়ে যায়।
(iii) তেজ্য সমভূমি : বাংলাদেশের ব-দ্বীপ অঞ্চলীয় সমভূমির দক্ষিণ ভাগের যে অংশে বঙ্গোপসাগরের জোয়ার ভাটার প্রভাব পরিলক্ষিত হয় সে অংশকে যােজ্য সমভূমি বলে। এ অঞ্চলে ছােট ছােট বহু নদীনালা আছে। এরা অসংখ্য শাখা প্রশাখায় ও খড়িতে বিভক্ত হয়ে বঙ্গোপসাগরে পড়েছে। এ সমভূমি অঞ্চলের অধিকাংশ অঞ্চল জুড়ে ম্যানগ্রোভ বৃক্ষের বনভূমি রয়েছে।এ বনভূমি সুন্দরবন নামে সুপ্রসিদ্ধ এ অঞ্চলের নদীতে প্লাবন খুব কম.
(iv) চট্টগ্রামের উপকূলীয় সমভূমি: এ সমভূমি, ফেনী নদী হতে কক্সবাজারের কিছু দক্ষিণ পর্যন্ত বিস্তৃত। এটি গড়ে প্রায় ৯.৬ কিলােমিটার প্রশস্ত । কিন্তু কর্ণফুলী নদীর মােহনায় এর দৈর্ঘ্য ২৫.৬ কিলােমিটার। এ সমভূমির কর্ণফুলী, সাঙ্গু, মাতামহুরী, বাশখালি প্ৰভৃত নদীবাহিত পলল দ্বারা গঠিত। এছাড়া সমুদ্র বটে বালু, সৈকত, বালিয়াড়ী, কর্দম ভূমি ইত্যাদি উপকূলীয় প্রাকৃতিক বৈশিষ্ট্যসমূহ এখানে পরিলক্ষিত হয়। এর কোনাে কোনাে স্থানে সমুদ্রের পানি থেকে লবণ তৈরি হয়।
এ অঞ্চলে প্রচুর কৃষিজ ফসলও হয় ।
উপসংহার : বাংলাদেশের অবস্থান ও ভূ-প্রকৃতি নিজেদের অস্তিত্ব রক্ষার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। প্রকৃতির এক অপরূপ সৌন্দর্য বিরাজ করে। আর এদেশের ভূ-প্রকৃতি মানুষের জীবনধারা ও সামগ্রীক কর্মকাণ্ড নিয়ন্ত্রণ করে। আর এ দেশের ভৌগােলিক অবস্থান সামগ্রীকভাবে অর্থনীতিকে নিয়ন্ত্রণ করে। কেননা বাংলাদেশের তিন দিকে ছিল এবং এক দিকে জলক আর এদিকে গড়ে উঠেছে বাংলাদেশের বাণিজ্যিক সামুদ্রিক বন্দর যা অর্থনীতির মূল পাইপ-লাইন।আর এ অপরূপ ভূ-প্রকৃতিতে সামন্যতম ও বিপর্যয় ঘটলে সামগ্রীকভাবে এ জনপদের মানুষ ক্ষতির স্বীকার হয়।তার প্রকৃতিকে রক্ষায় আমাদের সতর্ক সৃষ্টি রাখা একান্তই আবশ্যক।
স্বাধীন বাংলাদেশের অভ্যুদয়ে বাংলা ভাষার অবদান আলোচনা করো ?
উত্তরঃ ভাষা আন্দোলন থেকে স্বাধীনতা
৫ সেপ্টেম্বর, ২০১৭
458
–এম. আর. মাহবুব–
স্বাধীনতা একটি দেশের অমূল্য সম্পদ। ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর বহু ত্যাগ, তিতিক্ষা, সংগ্রাম ও রক্তের বিনিময়ে আমরা অর্জন করি আমাদের প্রাণপ্রিয় স্বাধীনতা। বিশ্বসভায় একটি স্বতন্ত্র জাতিসত্তা হিসেবে বাংলাদেশের অস্তিত্ব প্রকাশিত হয়েছে এই স্বাধীনতার মাধ্যমে। বাংলাদেশের মহান স্বাধীনতার বীজ কোথায়, কখন এবং কীভাবে রোপিত হয়েছিল তা নিয়ে নানাজনের নানা মত। কেউ কেউ ১৯৪০ সালের লাহোর প্রস্তাব, আবার অনেকে বঙ্গভঙ্গ আন্দোলন, পলাশীর যুদ্ধের পরাজয়, এমনকি ইখতিয়ার উদ্দিন মোহাম্মদ বিন বখতিয়ার খলজির বঙ্গ বিজয় থেকে কিংবা তারও আগে-পরে থেকে বাংলাদেশের জন্মের ইতিহাস খোঁজার চেষ্টা করেন। বাংলাদেশ নামক স্বতন্ত্র, স্বাধীন রাষ্ট্র সৃষ্টির পেছনে এসব ঘটনাবলির ঐতিহাসিক গুরুত্ব রয়েছে সত্য, তবে যে ঘটনাটি সবচেয়ে বেশি কাজ করেছে সেটা হলো ভাষা-আন্দোলন।
ভাষা-আন্দোলন মানে বাংলা ভাষার অধিকার প্রতিষ্ঠার আন্দোলন। বাংলাদেশের স্বাধীনতা আন্দোলনের সঙ্গে বাংলা ভাষার অধিকার প্রতিষ্ঠার আন্দোলনের রয়েছে এক গভীর ও চিরন্তন সম্পর্ক। বাংলা ভাষাকে পূর্ণতম রাষ্ট্রীয় মর্যাদার আসনে প্রতিষ্ঠার জন্য প্রয়োজন ছিল সম্পূর্ণরূপে বাংলা ভাষাভাষীদের নিয়ন্ত্রণাধীন একটি স্বতন্ত্র স্বাধীন রাষ্ট্র। সে রকম একটি রাষ্ট্র হলো বাংলাদেশ- বাংলা ভাষার ওপর ভিত্তি করে যার জন্ম। বাংলা ভাষা সৃষ্টির পর থেকে এই ভাষার অধিকার প্রতিষ্ঠায় যুগ যুগ ধরে বিভিন্ন বাঙালি মনীষী বিভিন্নভাবে অবদান রাখেন। ১৯৫২ সালে একটি রক্তস্নাত আন্দোলনের সূচনা হয়েছিল ১৯৪৭ সালের দেশ বিভাগের পর ১৭ দিনের মাথায় তমদ্দুন মজলিস নামক একটি সাংস্কৃতিক সংগঠন প্রতিষ্ঠার মধ্য দিয়ে। ১৯৪৭ থেকে ১৯৭১। এই চব্বিশ বছরে ভাষা-আন্দোলন, স্বায়ত্তশাসন ও স্বাধিকার আন্দোলনের পথ বেয়ে একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠিত হয় বাংলাদেশ। ভাষা-আন্দোলন ছিল একাত্তরের মহান মুক্তিযুদ্ধের পটভূমি ও পূর্বপ্রস্তুতি। এ যুদ্ধের অর্জন, প্রাপ্তি ও বিজয় আমাদের সাহস জুগিয়েছে সামনে এগোবার। একুশের চেতনা আমাদের প্রাণে যে বিদ্রোহের দাবানল ও অগ্নিশিখা প্রজ্বলিত করেছে তার আলোকবর্তিকা হলো ‘৭১-এর মুক্তিযুদ্ধ। স্বাধীনতাপিপাসু বাঙালিদের মুক্তিযুদ্ধের প্রেক্ষাপট তৈরি করেছিল ভাষা-আন্দোলন। অর্থাৎ ভাষা-আন্দোলন ছিল বাঙালির প্রথম পর্যায়ের মুক্তিযুদ্ধ।
ভাষাভিত্তিক জাতীয়তাবাদের মৃত্তিকার ওপর স্বাধীন সার্বভৌম বাংলা ভাষাভাষী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা এক অবিস্মরণীয় ও ঐতিহাসিক ঘটনা। পৃথিবীর রাষ্ট্র গঠনের নানা উপাচারের এটি এক নতুন মাত্রা এবং বিরল দৃষ্টান্ত। বাঙাাল জাতি পৃথিবীর ইতিহাসে এক অনন্য জাতি হিসেবে এই বিরল দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে। ভাষা-আন্দোলন থেকে স্বাধীনতা অর্থাৎ বাংলা ভাষা থেকে বাংলাদেশ এক বাস্তব ও ঐতিহাসিক সত্য। এই সত্যকে অস্বীকার করার কোন উপায় নেই। ভাষাসৈনিক, রাজনীতিবিদ, বুদ্ধিজীবী ও স্বাধীনতা সংগ্রামের মহান স্থপতিরা সকলেই এ ব্যাপারে একমত পোষণ করেন। বাংলাদেশের স্বাধীনতা লাভের মূল নায়ক ও প্রতিষ্ঠাতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এ প্রসঙ্গে বলেছেন- “বাংলাদেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব ভাষা-আন্দোলনেরই সুদূরপ্রসারী প্রতিশ্রুতি।” (সূত্র- দৈনিক সংবাদ : ২১ ফেব্রুয়ারি, ১৯৭৫)। স্বাধীনতা সংগ্রামের অন্যতম নায়ক এবং পরবর্তীকালে প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দিন আহমদ বলেছেন : ‘ঐতিহাসিক ভাষা-আন্দোলন বছরের পর বছর ধরে পাকিস্তানি চক্রের বিরুদ্ধে সংগ্রাম করতে বাঙালিদের উদ্বুদ্ধ করেছে। আর তারই পরিণতিতে সূচনা হয়েছে স্বাধীনতা সংগ্রামের।’ (দৈনিক বাংলা : ২৫ ফেব্রুয়ারি, ১৯৭২)।
বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের আরেক অন্যতম বীরসেনানী, পরবর্তীকালে বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান বলেছেন, ভাষা-আন্দোলনের মাধ্যমে সৃষ্ট জাতীয়তাবাদী চেতনায় উদ্বুদ্ধ হয়ে ১৯৭১ সালে আমরা স্বাধীনতাযুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়ি’ (দৈনিক আজাদ : ২৫ ফেব্রুয়ারি, ১৯৮১) অথবা জিয়ার ভাষায় : ‘ভাষা-আন্দোলনের ঐতিহাসিক পথ বেয়েই একদিন বিশ্ব মানচিত্রে আবির্ভাব ঘটে স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশের।’ (দৈনিক দেশ, ২১ ফেব্রুয়ারি, ১৯৮১)।
মার্কসীয় অর্থনীতির বিচার-বিশ্লেষণের অন্যতম প্রাগ্রসর লেখক সাঈফ-উদ-দাহার রাষ্ট্রভাষা থেকে স্বাধীনতাযুদ্ধের ধারাবাহিকতা বিশ্লেষণ করতে গিয়ে বলেছেন- ‘রাষ্ট্রভাষা ও শিক্ষার জন্য আন্দোলন ও তার পরবর্তী স্বায়ত্তশাসন আন্দোলনের পরিণতি হচ্ছে ১৯৭১ সালের স্বাধীনতাযুদ্ধ এবং স্বতন্ত্র রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশের প্রতিষ্ঠা।’ (রাষ্ট্রভাষা থেকে স্বাধীনতাযুদ্ধ এবং তারপর, ঢাকা-নওরোজ কিতাবিস্তান ১৯৮৬, পৃঃ ১১৮)। প্রখ্যাত কথাশিল্পী ও ভাষাসৈনিক অধ্যাপক শাহেদ আলী বলেছেন, ‘ভাষা-আন্দোলন নিছক ভাষা-আন্দোলন ছিল না। এর পেছনে দৃঢ়চেতনা কাজ করেছিল। সত্যিকার স্বাধীনতা ও সভাকে টিকিয়ে রাখার জন্য এ আন্দোলন করা হয় (দৈনিক আজাদ, ২৫ ফেব্রুয়ারি, ১৯৮১)। অধ্যাপক সিরাজুল ইসলাম চৌধুরীর ভাষায়, ‘একমাত্র রাষ্ট্রভাষা নিয়ে একটি নতুন রাষ্ট্রের অভ্যুদয়, ধাপে ধাপে অগ্রসর হয়েছে আন্দোলন। ধাপগুলো যে রাজনৈতিক সে বিষয়ে সন্দেহ রাখি কি করে।’ (দৈনিক সংবাদ, ২১ ফেব্রুয়ারি, ১৯৮০)। কবি বেগম সুফিয়া কামাল বলেছেন, ‘ভাষা আন্দোলনের সাহসী সৈনিকদের অবদান বাঙালিকে স্বাধীনতা সংগ্রামে লিপ্ত করে দেশকে স্বাধীন করেছে।’ (দৈনিক রূপালী, ১ সেপ্টেম্বর, ১৯৯১)।
এ ধরনের আরো অসংখ্য মতামত রয়েছে। জাতীয় সব গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিই ভাষা-আন্দোলনকে একইভাবে স্বাধীনতা আন্দোলনের সূচক বলে বর্ণনা করেছেন। এবার দেখা যাক ভাষা-আন্দোলন কখন ও কীভাবে শুরু হয়েছে। ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধকালীন আগস্ট মাসে কলকাতার মুক্তধারা প্রকাশ করে ‘রক্তাক্ত বাংলা’ গ্রন্থটি। এ গ্রন্থে অধ্যাপক ড. আনিসুজ্জামান স্বাধীনতার বীজ বপনকাল খুঁজতে গিয়ে লিখেছেন : “আরম্ভের আগেও আরম্ভ আছে। ২৬ মার্চের আগে একুশে ফেব্রুয়ারি। একুশে ফেব্রুয়ারির শুরু ১৯৪৭-৪৮ সালের ছায়াচ্ছন্ন দিনগুলোতে (রক্তাক্ত বাংলা : কলকাতা, মুক্তধারা, ১৯৭১ পৃঃ ৫৮)। বিষয়টি আরো পরিষ্কারভাবে বলেছেন ভাষাসৈনিক অ্যাডভোকেট গাজীউল হক। তিনি বলেছেন : ‘বাংলার মানুষের মুক্তিযুদ্ধের শুরু এখন নয়। বাঙালি যুদ্ধে নেমেছে পাকিস্তান সৃষ্টির পর থেকেই। শোষণচক্রের এ আক্রমণ কোনো বিচ্ছিন্ন আক্রমণ হয়। তাদের এ আক্রমণ অনেকগুলো ব্যর্থ আক্রমণের পর এক চূড়ান্ত আক্রমণ। পাকিস্তান সৃষ্টির থেকেই পশ্চিম পাকিস্তানি শাসক ও শোষক শ্রেণি আক্রমণ করেছে বাংলার মানুষকে, বাংলার সাংস্কৃতিকে, সংস্কৃতির বাহন ভাষাকে। সবার ওপর বাংলার বাঙালিত্বকে।’ (এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম, ঢাকা, পুঁথিপত্র প্রকাশনী, ১৯৭৮, পৃঃ ৩৩) তাহলে ১৯৪৭ সাল থেকে ভাষা-আন্দোলনের মাধ্যমে অর্থাৎ বাংলা ভাষার সংগ্রাম থেকে স্বাধীনতা আন্দোলনের ধারাবাহিকতা শুরু হয়েছে এ কথা বলা যায় নিঃসন্দেহে। কিন্তু এ প্রক্রিয়াটি শুরু হলো কীভাবে। এ ব্যাপারে অনেক তথ্য ও লেখা পাওয়া যায়। এখানে একটি উদ্ধৃতি দেওয়া হলো- ‘১৯৪৭ সালে দেশ বিভাগের ১৮ দিন পর ১ সেপ্টেম্বর তৎকালীন শাসকগোষ্ঠীর শোষণ ও স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে প্রথম সাংগঠনিক তৎপরতা শুরু হয় ‘তমদ্দুন মজলিস’ প্রতিষ্ঠার মধ্য দিয়ে। সে সময় তমদ্দুন মজলিসের রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ গঠন ও সর্বদলীয় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ গঠনের মাধ্যমে ভাষা-আন্দোলনের আবহ সৃষ্টি হয়। এর পথ ধরেই আমাদের স্বাধীনতা আন্দোলনের বিকাশ লাভ করে। মূলত স্বাধীনতার বীজ এ দিনেই রোপিত হয়েছে বলে ধরা হয়’ (দৈনিক জনতা : ১ সেপ্টেম্বর, ১৯৯১)।
আন্দোলনের বিকাশ ও পরিণতির ধারাবাহিকতা সম্পর্কেও বিভিন্ন অভিমত রয়েছে। “১৯৪৭ থেকে ১৯৭১ সাল পর্যন্ত তৎকালীন পূর্ব-পাকিস্তানের বাঙালিদের ‘ভাষাপ্রীতি’ থেকে ভাষা-আন্দোলন, ভাষা-আন্দোলন থেকে স্বায়ত্তশাসন, স্বায়ত্তশাসন থেকে স্বাধিকার, আর স্বাধিকার থেকে স্বাধীনতা- এভাবে ভাষার সংগ্রাম থেকে উত্তরোত্তরভাবে মুক্তির সংগ্রামে গিয়ে বাঙালি উত্তীর্ণ হয়েছে এবং সফলকাম হয়েছে। (সূত্র : তপন চৌধুরী লিখিত ২১ ফেব্রুয়ারির একটি সমকালীন সমীক্ষা, বাংলার বাণী, ২১ ফেব্রুয়ারি, ১৯৭৪)। হারান ব্যানার্জী বলেছেন- ‘ভাষা-আন্দোলনকে কেন্দ্র করে বাংলাদেশের পরবর্তী আন্দোলনগুলোর বিকাশ। ১৯৫৪, ৫৭, ৬১, ৬৯ এবং সর্বোপরি ১৯৭১ সালের স্বাধীনতা সংগ্রাম সব কিছুরই উৎস ভাষা আন্দোলন’ (বাংলার বাণী : ২১ ফেব্রুয়ারি, ১৯৭৪)। ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন মুক্তিযুদ্ধের ব্যাপারে সাধারণ্যে প্রকৃত ধারণা সৃষ্টি করার জন্য যেসব বইপত্র প্রকাশিত হয়, সেগুলোর মধ্যে কলকাতার মুক্তধারা থেকে সে বছর আগস্ট মাসে প্রকাশিত রক্তাক্ত বাংলা অন্যতম। উক্ত গ্রন্থে রণেশ দাসগুপ্ত পূর্বে বাংলার জাতীয় সংগ্রামের গতি-প্রকৃতি ব্যাখ্যা করতে গিয়ে বলেন : ‘১৯৪৭ থেকে ১৯৭১ পর্যন্ত ২৪ বছরের ঘটনাবলি একটা চুম্বক। পর্যায়ের পর পর্যায়ে যে ঘটনা দ্বারা দ্বন্দ্বাত্মক গতিপথে অগ্রসর হয়ে ১৯৪৭-৪৮ সালের নিয়মতান্ত্রিক গণতন্ত্র ও প্রাদেশিক স্বায়ত্তশাসনের অধিকার আদায়ের আন্দোলন থেকে বৈপ্লবিক গণতন্ত্রের সংগ্রামে এবং সার্বভৌম স্বাধীনতা ঘোষণায় উপনীত হল ১৯৭১ সালে, এখানে তার ভ্রমাত্মক ও বিপ্লবাত্মক ধাপগুলো ধরা পড়বে।’
উপরোক্ত আলোচনা থেকে আমরা এই সিদ্ধান্তে উপনীত হতে পারি যে, আমাদের স্বাধীনতা আন্দোলন এক বিরাট ধারাবাহিক আন্দোলনের পরিণতি। যে আন্দোলনের উৎসমূল ছিল বাংলা ভাষাকে কেন্দ্র করে। ১৯৪৭ সালের ১ সেপ্টেম্বর তমদ্দুন মজলিস প্রতিষ্ঠার পর ভাষা আন্দোলন ও স্বায়ত্তশাসনের যে দাবি তোলা হয়েছিল সে দাবির ধারাবাহিকতার স্বাধিকার আন্দোলন, স্বাধীনতা আন্দোলন এবং পরিশেষে বাংলাদেশের স্বাধীনতা অর্জন অর্থাৎ ভাষা-আন্দোলনের সূচনার মধ্য দিয়ে স্বাধীনতার বীজ প্রোথিত হয়েছিল।
অধ্যায় 2
অতি সংক্ষিপ্ত প্রশ্নাবলী
ঐতিহাসিক লাহোর প্রস্তাব উত্থাপিত হয় কত সালে এবং কে উত্থাপন করেন ?
উত্তরঃ ঐতিহাসিক লাহোর প্রস্তাব উত্থাপিত হয় ১৯৪০ সালের ২৩ মার্চ। পাকিস্তানের লাহোরে মুসলিম লীগের সম্মেলনে যোগ দিয়ে শেরে বাংলা একে ফজলুল হক এই প্রস্তাব তুলেন।
অবিভক্ত বাংলার শেষ মুখ্যমন্ত্রী কে ছিলেন?
উত্তরঃ অবিভক্ত বাংলার শেষ মুখ্যমন্ত্রী হলেন হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী।
ভারত স্বাধীনতা আইন কত সালে পাশ হয়?
উত্তরঃ ১৯৪৭ সালের ১৮ই জুলাই এই আইনটি রাজকীয় সম্মতি পেয়েছিল, এবং এইভাবে ১৯৪৭ সালে ভারত ও পাকিস্তান (তখন পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তান, এখন বাংলাদেশ ও পাকিস্তান) অঞ্চল তৈরি হয়। ...
সংক্ষিপ্ত প্রশ্নাবলী
লাহোর প্রস্তাব সম্পর্কে কি জানো?
উত্তরঃ লাহোর প্রস্তাব বা পাকিস্তান প্রস্তাব, যাকে পাকিস্তানের স্বাধীনতার ঘোষণাও বলা হয়, তা হচ্ছে ভারতীয় উপমহাদেশে বসবাসকারী মুসলিমদের জন্য একটি পৃথক রাষ্ট্রের দাবী জানিয়ে উত্থাপিত প্রস্তাবনা।[১] ১৯৪০ সালের ২৩ মার্চ লাহোরে অনুষ্ঠিত মুসলীম লীগের অধিবেশনে মুহাম্মদ আলী জিন্নাহ এর সভাপতিত্বে মুসলিম লীগের পক্ষ হতে ঐতিহাসিক লাহোর প্রস্তাবের প্রারম্ভিক খসড়া তৈরি করেন পাঞ্জাবের মুখ্যমন্ত্রী সিকান্দার হায়াত খান যা আলোচনা ও সংশোধনের জন্য নিখিল ভারত মুসলিম লীগের সাবজেক্ট কমিটি সমীপে পেশ করা হয়। সাবজেক্ট কমিটি এ প্রস্তাবটিতে আমূল সংশোধন আনয়নের পর ২৩ মার্চ সাধারণ অধিবেশনে মুসলিম লীগের পক্ষ হতে বাংলার মুখ্যমন্ত্রী আবুল কাশেম ফজলুল হক সেটি উপস্থাপন করেন এবং চৌধুরী খালিকুজ্জামান ও অন্যান্য মুসলিম নেতৃবৃন্দ তা সমর্থন করেন। [২] মূল প্রস্তাবটি ছিল উর্দু ভাষায়। এই সম্মেলনে ফজলুল হককে "শেরে বাংলা" উপাধি দেয়া হয়।
অখন্ড বাংলা আন্দোলন কি?
উত্তরঃ ব্রিটিশ ভারতের রাজনৈতিক ইতিহাসে যে কয়টি ঘটনা মোটামুটি ভাবে আলােচিত হয়েছিল তার মধ্যে ১৯৪৭ সালের অখণ্ড স্বাধীন বাংলা রাষ্ট্র গঠনের উদ্যোগ অন্যতম। ঐতিহাসিক লাহাের প্রস্তাবের মাধ্যমে বাংলার জনগণ স্বাধীন সার্বভৌম বাংলা রাষ্ট্রের স্বপ্ন দেখতে শুরু করে। যার ফলে দেখা যায় যে বাঙ্গালীরা মুসলিম লীগকে বাংলার যথাযােগ্য প্রতিনিধিত্বকারী দল হিসেবে ১৯৪৫ সালের নির্বাচনে তা সুস্পষ্টভাবে প্রমাণিত হয় । কিন্তু ১৯৪৫ সালে মুসলিম লীগের দলীয় সম্মেললে এক ঘৃন্যতম ষড়যন্ত্রের মাধ্যমে লাহাের প্রস্তাবকে সংশােধন করা হয়। এবং বাংলার স্বাধীনতায় ভাটা পড়ে। কিন্তু তারপরে ও বাংলার জনগণ ১৯৪৭ সালে অখণ্ড স্বাধীন বাংলা গঠনের জন্য উদ্যোগ নেন। অখণ্ড স্বাধীন রাষ্ট্র গঠনের পটভূমি ও বাঙ্গালী নেতৃবৃন্দ চেয়েছিল হিন্দু মুসলমান সবাইকে নিয়ে এক অখণ্ড স্বাধীন গঠন করতে।
1906 সালে মুসলিম লীগ গঠন আলোচনা করো?
বাংলাদেশ মুসলিম লীগ বাংলাদেশের একটি রাজনৈতিক দল যা ১৯০৬ সালে প্রতিষ্ঠিত নিখিল ভারত মুসলিম লীগ থেকে উদ্ভূত হয়েছিল।[১][২] ১৯৭১ সালে বাংলাদেশ স্বাধীনতার পর বাংলাদেশের সকল দলের সাথে এ দলটিও নিষিদ্ধ ছিল এবং ১৯৭৬ সালে আইনগতভাবে বৈধতা পায়। এরপরে আবদুস সাবুর খান মুসলিম লীগকে পুনরুজ্জীবিত করেন এবং দলের সভাপতি নির্বাচিত হন।[৩] বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের সঙ্গে যোগ দেওয়ার পর তার একজন নেতা শাহ আজিজুর রহমান বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী হন।[৩] ইতিহাস[সম্পাদনা]
বাংলাদেশ মুসলিম লীগ ১৯০৬ সালে ঢাকায় ব্রিটিশ রাজ্যের অল ইন্ডিয়া মুসলিম লীগ প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। মুঘলদের সমর্থন ও ভারতবর্ষের অন্যান্য গোষ্ঠীগুলোর বিরোধিতা না করে ভারতের মুসলমানদের রক্ষা করার লক্ষ্যে এই সংগঠনটি প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল।
১৯৪৭ সালে ভারতের বিভাজন ও পাকিস্তান স্বাধীনতার পর, অল ইন্ডিয়া মুসলিম লীগ পাকিস্তান মুসলিম লীগ হয়ে ওঠে। পূর্ব পাকিস্তানে পাকিস্তান মুসলিম লীগ ক্ষমতায় আসে। পূর্ব পাকিস্তানে ১৯৫৫ সালের নির্বাচনে ইউনাইটেড ফ্রন্টে প্রাদেশিক আইন পরিষদ নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলে। ১৯৬০-এর দশকে মুসলিম লীগ দুটি পৃথক দল, পাকিস্তান মুসলিম লীগ (কনভেনশন) এবং কাউন্সিল মুসলিম লীগে বিভক্ত হয়।
১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের পর পূর্ব পাকিস্তান হয়ে ওঠে বাংলাদেশ এবং পাকিস্তান মুসলিম লীগ (কনভেনশন) এবং কাউন্সিল মুসলিম লীগ সহ সকল ধর্ম ভিত্তিক দল নিষিদ্ধ করা হয়।
১৯৭৬ সালে রাজনৈতিক দলসমূহ নিয়ন্ত্রণ অধ্যাদেশ পাস করা হয় যা উভয় পক্ষকে বৈধতা করে দেয়। এরপর উভয় দল একত্রিত হয় এবং ১৯৭৬ সালের ৮ আগস্ট বাংলাদেশ মুসলিম লীগ গঠিত হয়।[৪][৫]
১৯৭৮ সালে বাংলাদেশ মুসলিম লীগ দুটি ভগ্নাংশে বিভক্ত হয়েছিল। আবদুস সবুর খান দলটির রক্ষণশীল ভগ্নাংশের নেতৃত্ব দেন এবং শাহ আজিজুর রহমান উদারপন্থী ভগ্নাংশের নেতৃত্ব দেন। আজিজুর রহমান শীঘ্রই বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের সাথে যোগ দেন।[৫] ১৯৭৯ সালে আবদুস সবুর খানের নেতৃত্বে বাংলাদেশ মুসলিম লীগ সংসদ নির্বাচনে ২০ টি আসন জিতেছিল।[২]
সাবুর খানের মৃত্যুর পর, বাংলাদেশ মুসলিম লীগ একাধিক ভগ্নাংশে বিভক্ত হয়ে যায়।[৫] দুইটি বিভক্ত অংশ (বাংলাদেশ মুসলিম লীগ ও বাংলাদেশ মুসলিম লীগ - বিএমএল) এখনও বাংলাদেশ নির্বাচন কমিশনের অধীনে নিবন্ধিত।[৬]
বাংলাদেশ মুসলিম লীগের বর্তমান সভাপতি অ্যাডভোকেট মোহম্মদ বদরুদ্দোজা আহমেদ সুজা ও সাধারণ সম্পাদক কাজী আবুল খায়ের।[৪][৬]
রচনামূলক প্রশ্নাবলী
লাহোর প্রস্তাবের মূল প্রতিপাদ্য বিষয় কি ছিল?
DËit ভারতীয় মুসলমানদের সামাজিক, সাংস্কৃতিক পরিচিতি এবং অধিকার রক্ষার জন্য ১৯০৬ সালে মুসলিম লীগ গঠিত হওয়ার পর থেকে মুসলমানদের পক্ষে কোথা বলা শুরু করে যা থেকে শুরু হয় বিভাজন। অবশেষে মুসলমানদের অধিকার রক্ষার জন্য আলাদা রাষ্ট্র গঠনের দাবি উঠে। এই দাবির মধ্য দিয়ে ব্রিটিশ ভারতে মুসলিম জাতীয়তাবাদের উত্থান হয়েছিল। এই দাবির আনুষ্ঠানিক ঘোষণা হচ্ছে লাহোর প্রস্তাব। ১৯৪০ সালের ২৩ মার্চ লাহোরে অনুষ্ঠিত মুসলিম লীগের সম্মেলনে যোগ দিয়ে শেরে বাংলা এ কে ফজলুল হক যে ভাষণ দেন তা ঐতিহাসিক লাহোর প্রস্তাব নামে পরিচিত। লাহোর প্রস্তাবের তিনটি প্রধান বিষয় ছিল।
ü ১. ভারতবর্ষের প্রতিটি এলাকাকে ভৌগলিক অবস্থান অনুযায়ী আলাদাভাবে চিহ্নিত করতে হবে।
ü ২. উত্তর-পশ্চিম এবং দক্ষিণ-পূর্ব ভারতের মুসলিম অধ্যুষিত এলাকাগুলোকে এমনভবে চিহ্নিত করতে হবে যাতে পরবর্তীতে আলাদা স্বাধীন এবং সার্বভৌমত্ব রাষ্ট্র গঠন করতে পারে।
ü ৩. রাষ্ট্রগুলো সঙ্খালগু সম্প্রদায়ের ধর্মীয়, সামাজিক, সাংস্কৃতিক, রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক এবং প্রশাসনিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করবে।
উপনিবেশিক শাসনামলে সাম্প্রদায়িকতার উদ্ভব ও এর ফলাফল ব্যাখ্যা করো?
DËit ভূমিকা : ভারতীয় উপমহাদেশে প্রধাণত দুটি ধর্মীয় সম্প্রদায়ের লােক বসবাস করে। একটি হচ্ছে হিন্দু অপর হচ্ছে মুসলিম । ভারতীয় ব্রিটিশ শাসন অর্জিত হওয়ার পূর্ব পর্যন্ত বাংলার হিন্দু ও মুসলমানদের সধ্যে সাংস্কৃতিক ও জাতীয় ঐক্য সমপ্রতি বজায় ছিল। কিন্তু ভারতে ব্রিটিশ শাসন কায়েম হলে তা নষ্ট হয়ে যায় এবং তাদের মধ্যে প্রকট বৈষম্য দেখা দেয়। হিন্দু ও মুসলমানরা ক্রমাম্বয়ে দূরে সরে যায়। একে অন্যের পরিপূরক না ভেবে শক্র ভাবা আরম্ভ করে । এতে করে তাদের মধ্যে জন্ম নেয় সাম্প্রদায়িক জাতীয়তা। মুসলমানরা তাদের ধর্মের ও সংস্কৃতির উপর ভিক্তি করে ইসলামী জাতীয়তা সৃষ্টি করে। অন্যদিকে হিন্দুরাও তাদের ধর্মীয় ও সামাজিক জীবনকে কেন্দ্র করে হিন্দু জাতীয়তা বােধ সাম্প্রদায়িকতা ও সাধারণভাবে সাম্প্রদায়িকতা বলতে ধর্মের নামে ধর্মতিরিক্ত লক্ষ্য সিদ্ধির জন্য কাজ করাকে বুশায় এরপ সাম্প্রদায়িকতা সম্পন্ন কোন সম্প্রদায় ধর্মকে ধর্মান্ধতায় রূপান্তর করে এবং রাজনৈতিক অর্থনৈতিক সামাজিক সাংস্কৃতিক ক্ষেত্রে নিজেদের প্রভাব প্রতিপত্তি বিস্তারের কাজে আত্মনিয়ােগ করে। তাই সাম্প্রদায়িকতা কথাটিকে বিভিন্ন অর্থে বিভিন্নভাবে প্রয়ােগ করা হয়। সাম্প্রদায়িক মনােভাব সম্পন্ন লােকেরা মনে করেন যে, তাদের ধর্মের অনুরাগীদের সকল স্বার্থ অভিন্ন এবং তা অন্য সম্প্রদায় থেকে পৃথক। এ সকল লােকেরা ধর্মীয় বিশ্বাসকেই সমাজ ও রাজনীতির ভিতি বলে মনে করে থাকেন। তাছাড়া সাম্প্রদায়িকেরা সাম্প্রদায়িক মতে বিশ্বাস ক ঔপনিবেশিক শাসন আমলে সাম্প্রদায়িকতা উদ্ভবের কারণ
১. ধর্মীয় কায়েমী স্বার্থের প্রভাব
ভারতবর্ষে বিভিন্ন শ্রেণি পেশার লােক বসবাস করে আসছিল। এভাবে বসবাসকারী মানুষদের মধ্যে সামাজিক দ্বন্ধ থাকা স্বাভাবিক। এ সকল দ্বন্দ্ব ছিল মূলত সুবিধাভােগী শ্রেণির সাথে অধিকারহীন শ্রেণির
দ্বন্ধ। ব্রিটিশ শাসন শুরু হলে ভারতে এই সকল শ্রেণির দ্বন্দ্ব আরাে প্রকট আকার ধারণ করে এই সুযােগে একধরনের কায়েমী স্বার্থ বিভিন্ন শ্রেণী পেশার লােকেদের মধ্যে ধর্মীয় ভেদাভেদ ঢুকিয়ে দেয়। শুরু হয় সাম্প্রদায়িকতার প্রথম ধাপ।
২. ব্রিটিশদের চক্রান্ত
ব্রিটিশদের চক্রান্তেই ভারতে সাম্প্রদায়ী বার্তা সৃষ্টির পিছনে বিশেষভাবে দায়ী। নবাব সিরাজউদ্দৌলার পতন ঘটলে ইংরেজরা ভারতবর্ষে মুসলমান সম্প্রদায়কে ভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গিতে দেখতে শুরু করেন। কেননা
তারা মনে করত যে, ভারত ব্রিটিশ শাসনের বিরুদ্ধে একমাত্র মুসলমানরাই মাথাচাড়া দিয়ে উঠতে পারে । তাই হিন্দুদেরকে পিছনে রেখে ব্রিটিশরা হিন্দুদের কে সহায়তা দিতে থাকেন। যা হিন্দু মুসলমান বিভেদ ঘটিয়ে সম্প্রদায়িকতার পথ প্রশস্ত করে।
৩. হিন্দু ও মুসলমানদের মধ্যে বৈষম্যের সৃষ্টি
ভারতে ঔপনিবেশিক শাসন আমলে হিন্দু ও মুসলমানদের মধ্যে যে বৈষম্য সৃষ্টি হয় তা সাম্প্রদায়িকতার পিছনে ইন্ধন জোগায় । ব্রিটিশরা ভারতবর্ষে যে শিক্ষা সংস্কৃতি ও জ্ঞান চর্চা গড়ে তুলেছিল হিন্দুরা তা গ্রহণ করলেও মুসলমানরা তা সঠিকভাবে গ্রহণ করতে পারেনি। যার ফলে সরকারী চাকুরী থেকে শুরু করে অফিস আদালত ব্যবসা-বাণিজ্যে হিন্দুরা একতরফা ভাবে এগিয়ে যায়। মুসলমানরা এ সকল প্রতিযােগীতায় টিকতে পেরে সর্বসান্ত হয়ে যায়। যার ফলে তারা হিন্দুদেরকে প্রতিপক্ষ ভাবতে শুরু করে। যা সাম্প্রদায়িকতার জন্ম দেয়।
আরো পড়তে পারেন: লাহাের প্রস্তাব কি মূলত পাকিস্তান প্রক্রিয়ার অংশ ছিল?
৪. মুসলমানদের ব্রিটিশ বিরােধী মনােভাব
ব্রিটিশ শাসনের পূর্বে সমগ্র ভারতবর্ষ মােটামুটিভাবে মুসলমানদের দ্বারাই নিয়ন্ত্রিত হত। কিন্তু ব্রিটিশরা মুসলিম শাসনের অবসান ঘটিয়ে ভারতে রাজনৈতিক কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করেন। ভারতীয় মুসলমানরা তাই কোনদিনও ব্রিটিশদেরকে ভালভাবে দেখতে পারেনি। তাই মুসলমানরা ছিল ব্রিটিশদের বিপক্ষে অন্যদিকে হিন্দুরা ছিল ব্রিটিশদের পক্ষে। ফলে তাদের মধ্যে দুরত্ব সৃষ্টি হয় ।
৫. চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের প্রবর্তন
১৭৯৩ সালে ব্রিটিশ সরকারের প্রবর্তিত চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত ভারতে সাম্প্রদায়িকতা সৃষ্টি করে। কেননা এতে মূলত হিন্দু জমিদারদেরই লাভ হয়। অন্যদিকে হিন্দু জমিদারদের অধিনস্থ মুসলিম প্রজাদের
অর্থনৈতিক অবস্থা দিন দিন খারাপ হতে থাকে। এতে মুসলমানদের এ ধারণা বদ্ধমূল হয় যে, ভারতে ব্রিটিশ শাসন। হিন্দুদের পরিপােষণ করার নীতি গ্রহণ করেছেন। অর্থাৎ হিন্দু ও মুসলমানদের সম্পর্কে উল্লেখযােগ্য পরিমাণ অবনতি হয়।
৬. হিন্দুদের চক্রান্ত
ভারতবর্ষের বেশির ভাগ কৃষক ও কারিগর শ্রেণীর লােকেরা ছিল মুসলমান। ঔপনিবেশিক শাসনামলে অর্থনীতি ও আইনের কাঠামাে মুসলমান কৃষকদেরকে আদালত ও হিন্দু আইনজিবদের দ্বারস্থ হতে এবং মুসলিম কারিগরদের কে হিন্দু ব্যবসায়ীদের খপ্পড়ে পড়তে বাধ্য করেছিল। এর ফলে অশিক্ষিত ও অনগ্রসর দরিদ্র মুসলমান ও কারিগরদের অবস্থা শােচনীয় করে তুলে।
৭. বিভিন্ন বৈষম্যমূলক নীতি
ঔপনিবেশিক শাসনামলে যে অর্থনৈতিক ব্যবস্থা প্রচলিত ছিল তাতে হিন্দু মহাজনরা ঋণের নামে সমগ্র কৃষক সমাজকে বিশেষ করে দরিদ্র মুসলমান কৃষকদের বেঁধে ফেলার ব্যবস্থা করা হয়। এতে করে
ঋণের দায়ে বহু মুসলমান জমি হারান। তাছাড়া, বাধ্যতামূলক বাণিজ্যিক পণ্য উৎপাদনের নীতি চালু করা হলে কৃষিক্ষেত্রে মুসলমানসহ অন্যান্য সকল সম্প্রদায়ের কৃষকদের নির্ভর করতে হতাে হিন্দু ব্যবসায়ীদের উপর ।
৮. ব্রিটিশ সরকারের মুসলমানদের প্রতি নেতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি
ব্রিটিশ সরকার সবসময়ই মুসলমানদের প্রতি নেতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি পােষন করে আসছিল । কেননা তারা দেখতে পায় যে, ভারতে ছােট বড় অনেকগুলাে আন্দোলন ও বিদ্রোহ সংগঠিত হয় মুসলমানদের নেতৃত্বে। বিশেষ করে ১৮৫৭ সালের মহাবিদ্রোহের পর ব্রিটিশ সরকার মুসলমানদের প্রতি চরম নেতিবাচক দৃষ্টি প্রদান করে। যা সাম্প্রদায়িকতার উদ্ভব ঘটায়।
৯. ধর্মভিত্তিক সংগঠন
ঔপনিবেশিক শাসন আমলে বেশ কিছু ধর্মভিত্তিক সংগঠন গড়ে উঠে। যা সাম্প্রদায়িকতার সৃষ্টি করে। যেমন, ১৮৬৭ সালে বেনারসের হিন্দুরা “উর্দু ভাষার পরিবর্তে “হিন্দি ভাষার প্রচলনের জন্য আন্দোলন
করেন। এতে মুসলমানরা ক্ষুব্ধ হন। তাছাড়া একই বছর নবগােপাল মিত্র “হিন্দু মেলা” নামে একটি প্রতিষ্ঠান তৈরি করেন। এটি ছাড়াও এসময় হিন্দুদের কিছু ধর্মীয় সংগঠন জনপ্রিয়তা লাভ করে । যা সাম্প্রদায়িকতাকে বাড়িয়ে তুলে।
১০.ধর্মীয় জাতীয়তাবােধের বিকাশের
ঊনবিংশ শতাব্দীর মাঝামাঝিতে কিছু ইংরেজদের ভূমিকায় হিন্দু সমাজে ধর্মীয় জাতীয়তাবাদের সূচনা হয় যা রাজনীতিতে প্রভাব পড়ে। বিভিন্ন হিন্দু কবি সাহিত্যিক তাদের রচনার মধ্য দিয়ে হিন্দুদেরকে হিন্দু জাতীয়তাবােধে উদ্বুদ্ধ করেন। তারা মুসলমান শাসনকে নেতিবাচকভাবে বর্ণনা করেন এবং ব্রিটিশ শাসনের প্রশংসা করেন। হিন্দুদের এ জাতিয়তাবােধ দেখে ইসলামী আলেমগণ মুসলিম জাতীয়তাবােধ জাগিয়ে তােলার প্রয়াস পান। তারা বিভিন্নভাবে হিন্দুদের বিরুদ্ধে জিহাদ করে। যা সাম্প্রদায়িকতার সূত্রপাত ঘটায়।
১১. কংগ্রেস প্রতিষ্ঠার
১৮৮৫ সালে ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেস প্রতিষ্ঠিত হলে সাম্প্রদায়িক সমস্যা আরােও বেশী করে ঘনীভূত হয়ে আসে। কেননা মুসলমানগণ লক্ষ্য করল যে, কংগ্রেস একটি হিন্দু প্রধান রাজনৈতিক দল। এর বেশির
ভাগ সদস্যই ছিল হিন্দু। তাছাড়া এ সময় ভারতে উর্দু- হিন্দী বিরােধ সৃষ্টি হয়। এককথায় কংগ্রেসের সকল সিদ্ধান্ত ছিল মুসলিম বিরােধী। এতে মুসলমানরা ক্ষুব্ধ হন এবং নিজেরাও বিভিন্ন ইসলামী সংগঠন গড়ে তােলেন।
১২. মনীষীদের প্রভাব
ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসন আমলে ভারতে হিন্দু ও মুসলমান উভয় সম্প্রদায়ের কিছু মনীষীর উদ্ভব ঘটে। এই মনীষীরা সাম্প্রদায়িকতা সৃষ্টিতে প্রভাব রাখে। রাজা রামমােহন রায়। ঈশ্বরচন্দ্র গুপ্ত, রঙ্গলাল বন্দোপাধ্যায় প্রমুখ ছিলেন হিন্দু মনীষী। তারা হিন্দুদেরকে বিভিন্নভাবে জাগিয়ে তুলেন। অন্যদিকে এ সময় স্যার সৈয়দ আহমদ খান, সৈয়দ আমীর আলী, নওয়াব আবদুল লতিফের মত কিছু মুসলিম মনীষী মুসলমানদেরকে জাগ্রত করে। ফলে উভয় সম্প্রদায় মুখােমুখি অবস্থান নেন।
১৩. বঙ্গভঙ্গ
ব্রিটিশরা ১৯০৫ সালে মুসলমানদেরকে কিছু সুবিধা দিয়ে বঙ্গকে বিভক্ত করেন। কিন্তু এটা ছিল মূলত ব্রিটিশদের ভাগ করা ও শাসন করা নীতিরই বহিঃপ্রকাশ। হিন্দুরা মুসলিম সুবিধা সংম্বলিত এই বঙ্গভঙ্গকে মেনে নিতে পারেনি। যাতে করে মুসলমানরা বঙ্গভঙ্গের পক্ষে আর হিন্দু বঙ্গভঙ্গের বিরুদ্ধে আন্দোলন করতে থাকে। যা সাম্প্রদায়িকতার সৃষ্টি করে ।
১৪. মুসলিম লীগ প্রতিষ্ঠার
১৯০৬ সালের ৩০ ডিসেম্বর ঢাকায় সর্বভারতীয় মুসলিম লীগ গঠিত হয়। এটি ছিল মুসলমানদের একটি রাজনৈতিক সংগঠন বিধায় এর সকল সদস্যই ছিল মুসলমান। তারা মুসলমানদের স্বার্থ রক্ষায় কর্মসূচী
গ্রহণ করে। হিন্দুরা এতে অসন্তুষ্ট হন। তারা জাতীয় কংগ্রেসের মাধ্যমে মুসলীম লীগের বিরােধিতা করেন। যার ফলে হিন্দু মুসলমানদের বৈরিতা চরম আকার ধারন করে সাম্প্রদায়িক রূপ নেয়।
উপসংহার : পরিশেষে বলা যায় যে, ভারতীয় উপমহাদেশে সাম্প্রদায়িক সমস্যা হচ্ছে ব্রিটিশদের দ্বারা সৃষ্ট একটি সমস্যা। ঔপনিবেশিক শাসন কায়েম করার জন্য ব্রিটিশরা সুকৌশলে হিন্দু ও মুসলমানদেরকে উভয়ের বিরুদ্ধে লেলিয়ে দেয়। যার ফলে এতদিন একসাথে বসবাসকারী হিন্দু ও মুসলমানগণ একে অপরের শত্রু ভাবতে থাকে। শুরু হয়ে যায় সাম্প্রদায়িকতা। পরবর্তীতে নানা কারণে এই সাম্প্রদায়িকতা তীব্র আকার ধারন করে। যা শেষ পর্যন্ত অখণ্ড ভারত বর্ষকে খণ্ডিত করে ফেলে। পরবর্তীতে হিন্দু আর মুসলমানরা চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী দুটি জাতি হিসেবে বিশ্বের দরবারে আত্মপ্রকাশ লাভ করে।
1947 সালে ভারত বিভক্তির কারণ উল্লেখ কর?
DËit ১৯৪৭ সালের ভারত বিভাজন বা দেশভাগ হল ব্রিটিশ ভারতকে[গ] দুটি স্বাধীন অধিরাজ্য ভারত ও পাকিস্তানে বিভজক্ত করার ঘটনা।[৬] ভারত অধিরাজ্য বর্তমান সময়ে ভারতীয় প্রজাতন্ত্র; পাকিস্তান অধিরাজ্য বর্তমান সময়ে ইসলামি প্রজাতন্ত্রী পাকিস্তান ও গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ হিসাবে পরিচিত। বিভাজনের ঘটনাটি জেলা-ভিত্তিক অমুসলিম বা মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠতার ভিত্তিতে বাংলা ও পাঞ্জাব প্রদেশের বিভাজনের সাথে জড়িত ছিল। ভারত বিভাজনের সঙ্গে সঙ্গে ব্রিটিশ ভারতীয় সেনাবাহিনী, রাজকীয় ভারতীয় নৌবাহিনী, ইন্ডিয়ান সিভিল সার্ভিস, রেল ও কেন্দ্রীয় কোষাগারও বিভক্ত করে দেওয়া হয়। এই বিভাজনটি ভারতীয় স্বাধীনতা আইন ১৯৪৭-এ বর্ণিত হয়েছিল এবং এর ফলে ভারতে ব্রিটিশ রাজ বা ক্রাউন শাসনের অবসান ঘটে। দুটি স্ব-শাসিত দেশ ভারত ও পাকিস্তান আইনত ১৯৪৭ সালের ১৫ আগস্ট মধ্যরাতে অস্তিত্ব লাভ করে।
এই বিভাজনটি ধর্মীয় ভিত্তিতে ১ কোটি থেকে ২ কোটি মানুষকে বাস্তুচ্যুত করে এবং সদ্য প্রতিষ্ঠিত অধিরাজ্য দুটিতে অতিমাত্রায় শরণার্থী সংকট তৈরি করে।[২][৩][৪][৫] বিভাজনের অব্যবহিত পূর্বে ও পরে প্রাণহানির ঘটনা সহ বড় আকারে সহিংসতা হয়, বিতর্ক সাপেক্ষে মনে করা হয়, সহিংসতায় ১ লাখ থেকে ২০ লাখ মানুষ প্রাণ হারিয়েছিলেন।[১][ঘ] দেশ বিভাজনে সহিংসতার প্রকৃতি ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে বৈরিতা ও সন্দেহের পরিবেশ তৈরি করেছিল, যা আজ অবধি তাদেরসম্পর্কের উপর প্রভাব ফেলে।
ভারতের বিভাজন শব্দটি ১৯৭১ সালে পাকিস্তান থেকে বাংলাদেশের বিচ্ছিন্নতা বা ব্রিটিশ ভারতের প্রশাসন থেকে বার্মা (বর্তমানে মিয়ানমার) ও সিলনের (বর্তমানে শ্রীলঙ্কা) বিচ্ছিন্নতার বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত করে না।[ঙ] এই শব্দটি দুটি নতুন আধিরাজ্যের মধ্যেকার দেশীয় রাজ্যসমূহের রাজনৈতিক সংহতকরণকেও, বা দেশীয় রাজ্য হিসাবে হায়দ্রাবাদ, জুনাগড় এবং জম্মু ও কাশ্মীরের সংযুক্তি বা বিভাজনের বিরোধের বিষয়টিকেও অন্তর্ভুক্ত করে না, যদিও কিছু ধর্মীয় ধারায় দেশীয় রাজ্যে সহিংসতা ছড়িয়ে পড়েছিল। এটি ১৯৪৭–১৯৫৪ খ্রিস্টাব্দের সময়কালে ফরাসি ভারতের ছিটমহল ভারতে অন্তর্ভুক্ত করা বা ১৯৬১ সালে গোয়া ও পর্তুগিজ ভারতের অন্যান্য জেলাসমূহকে ভারতের দ্বারা অধিগ্রহণ করার বিষয়টকেও অন্তর্ভুক্ত করে না। এই অঞ্চলে ১৯৪৭ সালের অন্যান্য সমসাময়িক রাজনৈতিক সত্ত্বা, সিকিম রাজ্য, ভুটান রাজ্য, নেপাল রাজ্য ও মালদ্বীপ বিভাজনের দ্বারা প্রভাবিত হয়নি।[চ]
দেশীয় রাজ্যসমূহে প্রায়শই শাসকদের সম্পৃক্ততা বা আত্মতুষ্টির সাথে সহিংসতা অত্যন্ত সংঘবদ্ধ ছিল। এটা বিশ্বাস করা হয় যে শিখ রাজ্যে (জিন্দ ও কাপুরথালা ব্যতীত) মহারাজারা মুসলমানদের জাতিগত নির্মূলকরণে আত্মতৃপ্ত ছিলেন, যখন পাতিয়ালা, ফরিদকোট ও ভরতপুরের মহারাজারা তাদের আদেশ দেওয়ার ক্ষেত্রে জড়িত ছিলেন। কথিত আছে যে, ভরতপুরের শাসক তাঁর জনগণের জাতিগত নির্মূলকরণ প্রত্যক্ষ করেছিলেন, বিশেষত দীঘের মতো স্থানসমূহে।[১০]
অধ্যায় 3
অতি সংক্ষিপ্ত প্রশ্নাবলী
পাকিস্তানের প্রথম প্রধানমন্ত্রী কে ছিলেন?
DËit লিয়াকত আলী খান, স্বাধীনতার পরে পাকিস্তানের প্রথম প্রধানমন্ত্রী হিসাবে দায়িত্ব পালন করেছিলেন (১৯৪৭-১৯৫১)।
সংক্ষিপ্ত প্রশ্নাবলী
শিক্ষা ও সামাজিক ক্ষেত্রে পূর্ব পাকিস্তানের বৈষম্য সমূহ লিখ
১৯৫৬ সালের পাকিস্তান সংবিধানের প্রধান বৈশিষ্ট্য ব্যাখ্যা করো
রচনামূলক প্রশ্নাবলী
পূর্ব পাকিস্তানেরপ্রতি পশ্চিম পাকিস্তানিদের বৈষম্যমূলক নীতি সমূহ আলোচনা কর
পাকিস্তানের শাসনতান্ত্রিকইতিহাসের পশ্চিম পাকিস্তানের সামরিক ও রাজনৈতিক বৈষম্য আলোচনা করো
অধ্যায় 4
অতি সংক্ষিপ্ত প্রশ্নাবলী
1954 সালের নির্বাচনে যুক্তফ্রন্টকত দফা ঘোষণা করেন
তমদ্দুন মজলিস কে প্রতিষ্ঠা করেন
ভাষা আন্দোলনের দুজন শহীদের নাম লিখ
সংক্ষিপ্ত প্রশ্নাবলী
তমুদ্দিন মজলিস কি
যুক্তফ্রন্ট 21 দফা কর্মসূচি কি
রচনামূলক প্রশ্নাবলী
1952 সালের ভাষা আন্দোলনের পটভূমি ও ঘটনা প্রবাহের বিবরণ দাও
1954 সালের নির্বাচনে যুক্তফ্রন্টের21 দফা কর্মসূচির বর্ণনা দাও
অধ্যায় 5
অতি সংক্ষিপ্ত প্রশ্নাবলী
পাকিস্তানের প্রথম সামরিক শাসন কে জারি করেন
LFO এর পূর্ণরূপ কি
সংক্ষিপ্ত প্রশ্নাবলী
সামরিক শাসন এর সংজ্ঞা দাও
মৌলিক গণতন্ত্র কি
রচনামূলক প্রশ্নাবলী
সামরিক শাসন কি? সামরিক শাসনের তিনটি বৈশিষ্ট্য লিখ
1962 সালের ছাত্র আন্দোলন সম্বন্ধে যা জানো লিখ
অধ্যায় 6
অতি সংক্ষিপ্ত প্রশ্নাবলী
আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলার প্রধান আসামী কে ছিলেন
সংক্ষিপ্ত প্রশ্নাবলী
আগরতলা মামলার কারণ কি ছিল
ছয় দফা কর্মসূচিকে বাঙালির ম্যাগনাকার্টাবলা হয় কেন
রচনামূলক প্রশ্নাবলী
1966 সালের 6 দফা আন্দোলনের পটভূমি ও গুরুত্ব সম্পর্কে লেখ
আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলার কারণ ও ফলাফল আলোচনা করো
অধ্যায় 7
অতি সংক্ষিপ্ত প্রশ্নাবলী
কে কখন কোথায় শেখ মুজিবুর রহমানকে বঙ্গবন্ধু উপাধিতে ভূষিত করেন
সংক্ষিপ্ত প্রশ্নাবলী
11 দফা আন্দোলন কি
1969 সালের গণঅভ্যুত্থানের গুরুত্ব মূল্যায়ন করো
রচনামূলক প্রশ্নাবলী
1969 সালের গণঅভ্যুত্থানের কারণ ও তাৎপর্য ব্যাখ্যা করো
গণঅভ্যুত্থানের বিভিন্ন পর্যায় তুলে ধরো
অধ্যায় 8
অতি সংক্ষিপ্ত প্রশ্নাবলী
1970 এর নির্বাচনে আওয়ামী লীগ জাতীয় পরিষদে কয়টি আসন লাভ করেন
বঙ্গবন্ধুকে পশ্চিম পাকিস্তানের কোন কারাগারে আটক রাখা হয়
সংক্ষিপ্ত প্রশ্নাবলী
৭ মার্চের ভাষণের গুরুত্ব সংক্ষেপে আলোচনা করো
১৯৭০ নির্বাচনের ফলাফল লেখ
রচনামূলক প্রশ্নাবলী
১৯৭০ সালের নির্বাচনের ফলাফল ও তাৎপর্য ব্যাখ্যা করো
অধ্যায় 9
অতি সংক্ষিপ্ত প্রশ্নাবলী
অপারেশন সার্চলাইট কি
মুক্তিযুদ্ধের সর্বোচ্চ খেতাব কি
প্রবাসী সরকার কোথায় গঠিত হয়
প্রথমে বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দান করেন কোন দেশ
সংক্ষিপ্ত প্রশ্নাবলী
1.সংক্ষেপে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে ভারতের অবদান মূল্যায়ন কর?
উত্তরঃ ১৯৭১ সালের নয় মাসের মুক্তিযুদ্ধের ফলাফল স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশ। মুক্তিযুদ্ধের প্রাণ পুরুষ বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান, যুদ্ধকালীন সরকারের নেতৃত্ব দিয়েছিলেন তাজউদ্দিন আহমেদ, প্রকৃত বন্ধু রাষ্ট্র হিসেবে হাত বাড়িয়েছিল ভারত। পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর বর্বর নির্যাতনের শিকার হয়ে বাংলাদেশ থেকে ৯৮৯৯৩০৫ জন শরণার্থী ভারতের ভূখণ্ডে আশ্রয় নিতে বাধ্য হয়। প্রায় এক কোটি এই শরণার্থীকে ভারতের জনগণ ও সরকার হাসিমুখে আশ্রয় ও খাদ্য সহায়তা প্রদান করে। শুধু তাই নয়-মুক্তিযোদ্ধাদের ট্রেনিং, অস্ত্র ও গোলাবারুদ সরবরাহ করে। এসব কাজে তখন ভারতকে খরচ করতে হয়েছিল সাত হাজার কোটি টাকা। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে মিত্র বাহিনীর ভূমিকা রাখতে ভারতকে হারাতে হয়েছিল বহু অফিসার ও সৈনিককে। ১৯৭১ সালে পূর্ব ও পশ্চিম রণাঙ্গন মিলে শহীদ ভারতীয় সৈন্যের সংখ্যা ৩৬৩০ জন, নিখোঁজ ২১৩ জন এবং আহত ৯৮৫৬ জন। যাঁদের রক্ত এই স্বাধীন বাংলাদেশের মাটিতে মিশে রয়েছে।
মন্তব্যসমূহ
2.অপারেশন সার্চলাইট বলতে কি বুঝ?
উত্তরঃ পাকিস্তানি সেনারা ১৯৭১ সালের ২৫শে মার্চ রাতে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে (বর্তমানে বাংলাদেশ) যেগণহত্যার অভিযান চালিয়েছিল,তার নাম “অপারেশন সার্চলাইট” ।
“অপারেশন সার্চলাইট” নেতৃত্বঃ
“অপারেশন সার্চলাইট” -এর সার্বিক তত্ত্বাবধানের দায়িত্বে ছিলেন,গভর্নর লে. জেনারেল টিক্কা খান।
ঢাকা শহরে গণহত্যার মূল দায়িত্বে ছিলেন, মেজর জেনারেল রাও ফরমান আলী।
ঢাকার বাইরে দায়িত্বে ছিলেন, মেজর জেনারেল খাদিম হোসেন রাজা।
পরিকল্পনা পদ্ধতিঃ
২২ফেব্রুয়ারি ১৯৭১ এ পাকিস্তান সশস্ত্র বাহিনীর এক বৈঠকে গৃহীত প্রস্তাবের ভিত্তিতে – মার্চের শুরুতে ১৪তম ডিভিশনের জিওসি – মেজর জেনারেল খাদিম হুসাইন রাজা ও মেজর জেনারেল রাও ফরমান আলি মূল পরিকল্পনা তৈরি করেন।
অপারেশন পরিচালনার স্থানঃ
অপারেশন পরিচালনার জন্য চিহ্নিত স্থানগুলো ছিলঃ ঢাকা, খুলনা, চট্টগ্রাম, কুমিল্লা, যশোর, রাজশাহী, রংপুর, সৈয়দপুর এবং সিলেট।
“অপারেশন সার্চলাইট” এর কারনঃ
পাকিস্তানি সামরিক জান্তাদের কাছে বাঙালিরা সবসময়ই নীচু শ্রেণির ছিল ,যাঁদের ভাষা-সংস্কৃতি থেকে জীবনাচরণ সবই ছিল “অপাকিস্তানি” । অখণ্ড পাকিস্তানের নামে সেই অপাকিস্তানিদের “শুদ্ধ” করার জন্য অপারেশন সার্চলাইট শুরু করে।
যার ফলস্বরূপ, বিশ্বের অন্যতম ভয়াবহ গণহত্যা সংঘটিত হয়পূর্ব পাকিস্তানে (বর্তমানে বাংলাদেশ )।
“অপারেশন সার্চলাইটের” সিদ্ধান্ত সময়ঃ
অপারেশন সার্চলাইটের সিদ্ধান্ত হয়বেশ আগেই, ৭১ এর ফেব্রুয়ারি মাসে। ১৯৭২ সালে প্রকাশিত সাংবাদিক রবার্ট পেইনের “ম্যাসাকার” বইতে দেখা যায়, ১৯৭১ সালের ২২শে ফেব্রুয়ারি পশ্চিম পাকিস্তানের অনুষ্ঠিত এক সামরিক বৈঠকে- ইয়াহিয়া খান বাঙালিদের খতম করার সিদ্ধান্ত নেন।
ওইবৈঠকে ইয়াহিয়া খান বলেছিলেনঃ”(কিল থ্রি মিলিয়ন অব দেম, অ্যান্ড দ্য রেস্ট উইল ইট আউট অব আওয়ার হ্যান্ডস)।” “ওদের ৩০ লাখ মেরে ফেলো। বাদবাকিরা আমাদের হাত থেকেই খেয়ে বেঁচে থাকবে ” ।
‘অপারেশন সার্চলাইটের” মূল লক্ষ্যঃ
২৫শে মার্চ রাতে “অপারেশন সার্চলাইটের” মূল লক্ষ্য ছিল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রছাত্রী, রাজারবাগ পুলিশ লাইন এবং পিলখানায় ইপিআর বাঙালি জওয়ানেরা। এঅভিযানের আরও ছিল টেলিফোন, টেলিভিশন, রেডিও, টেলিগ্রাফসহ বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ এবং আন্তর্জাতিক যোগাযোগ ধ্বংস করা, আওয়ামী লীগ এবং এর ছাত্রসংগঠনসহ নিয়ে সর্বোচ্চ সংখ্যায় রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক নেতা-কর্মীর হত্যা করা, ঢাকাকে শতভাগ নিয়ন্ত্রণের মধ্যে আনা।
গণহত্যাঃ
সাংবাদিক রবার্ট পেইনের মতে, অভিযানের প্রথম রাতেই শুধু ঢাকা শহরে ৩০হাজার মানুষ হত্যা করা হয়। এরপর ,গণহত্যা চলতে থাকে শহর পেরিয়ে গ্রামে।
ভয়াবহতাঃ
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে ,বিশ্বে বাংলাদেশের গণহত্যাকে অন্যতম ভয়াবহ বলে উল্লেখ করেছেন, “সমাজবিজ্ঞানী” আরজে রুমেল। তিনি তাঁর “ডেথ বাই গভর্নমেন্টস “বইতে লিখেছেনঃ-
“ইয়াহিয়া খানের শাসনামলে পাকিস্তানি সেনা ও তাদের সহযোগীরা আধা সামরিক বাহিনীগুলো প্রতি ২৫ জন বাঙালির একজনকে হত্যা করেছে” । যার সবথেকে কদর্য ও কুৎসিত চেহারা দেখা গেছে “একাত্তরের” ২৬৭ দিনে।
গবেষক সুসান ব্রাউনমিলার, “অ্যাগেইনস্ট আওয়ার উইল: মেন-উইমেন অ্যান্ড রেপ” বইতে লিখেছেনঃ- ১৯৭১ সালে বাংলাদেশে ধর্ষণ এমন পর্যায়ে গিয়েছিল যে, আট বছরের শিশু থেকে ৭৫ বছরের বৃদ্ধা পর্যন্ত বর্বরতার শিকার হয়েছে।
মুক্তিযুদ্ধে বুদ্ধিজীবী হত্যাকাণ্ডের একটি চিত্র তুলে ধর
রচনামূলক প্রশ্নাবলী
১৯৭১ মুক্তিযুদ্ধ সম্পর্কে একটি নাতিদীর্ঘ নিবন্ধ লিখ?
উত্তরঃ মুক্তিযুদ্ধ ও মুক্তিযোদ্ধা
বাংলার ইতিহাসঃ মুক্তিযুদ্ধ
শেখ মুজিবুর রহমান ঐতিহাসিক ৭ মার্চের ভাষণ দেন-রেসকোর্স ময়দানে
অপারেশন সার্চসাইট-১৯৭১ সালেরৈ ২৫ মার্চ রাতের ঘটনা
বাংলাদেশ স্বাধীনতা ঘোষণা করেন- শেখ মুজিবুর রহমান, ২৫ মার্চ দিবাগত রাতে
(পরে ২৬ মার্চ চট্টগ্রামের আওয়ামী নেতা এম এ হান্নান চট্টগ্রাম বেতার থেকে শেখ মুজিবের পক্ষ থেকে স্বাধীনতার ঘোষণা প্রচার করেন। ২৭ মার্চ স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র থেকে প্রথম স্বাধীনতার ঘোষণা দেন-জিয়াউর রহমান
স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র স্থাপিত হয়-২৬ মার্চ, ১৯৭১ চট্টগ্রামের কালুঘাটে
মুজিবনগর সরকার গঠিত হয়-১০ এপ্রিল ১৯৭১, শপথ নেয়-১৭ এপ্রিল ১৯৭১
প্রথম স্বাধীন বাংলাদেশের সরকার গঠিত হয়-১৭ এপ্রিল ১৯৭১
বাংলাদেশ প্রজাতন্ত্র ঘোষণা করা হয়-১৭ এপ্রিল ১৯৭১
অস্থায়ী সরকারকে শপথ বাক্য পাঠ করান অধ্যাপক ইউসুফ আলী (১৭ এপ্রিল)
স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র পাঠ করেন-অধ্যাপক ইউসুফ আলী (১৭ এপ্রিল)
স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র পাঠ করা হয়-মেহেরপুর জেলার মুজিবনগরে
মুজিবনগরের অস্থায়ী সরকারের সদস্য-৬জন
রাস্ট্রপতি (সরকার প্রধান)-শেখ মুজিবুর রহমান
অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি/প্রেসিডেন্ট-সৈয়দ নজরুল ইসলাম (উপপরাস্ট্রপতি, অস্থায়ী রাস্ট্রপতির দায়িত্ব পালন করেন)
প্রধানমন্ত্রী-তাজউদ্দীন আহমেদ
অর্থমন্ত্রী-ক্যাপ্টেন মনসুর আলী
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী-এ এইচ এম কামরুজ্জামান
আইন, সংসদীয় ও পরাষ্ট্রমন্ত্রী-খন্দকার মোশতাক আহমদ
(এদেরকেই জাতীয় চার নেতা বলে অভিহিত করা হয়)
মুজিবনগর অবস্থিত- মেহেরপুরে
মুজিবনগরের পুরাতন নাম- বৈদ্যনাথতলার ভবেরপাড়া
মজিবনগর নামকরণ করেন-তাজউদ্দীন আহমেদ
মুজিবনগর সরকার গঠিত হয়-১৯৭১ সালের ১০ এপ্রিল
অস্থায়ী সরকারের সচিবালয়-৮ থিয়েটার রোড, কলকাতা
প্রথম সশস্ত্র প্রতিরোধ গডে তোলে-ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্ট
মুক্তিবাহিনীর সর্বাধিনায়ক- জেনারেল এম এ জি ওসমানী
জেনারেল ওসমানীকে মুক্তিবাহিনীর সর্বাধিনায়ক পদে নিয়োগ দেয়া হয়-১৮ এপ্রিল ১৯৭১
বিমান বাহিনীর প্রধান-ক্যাপ্টেন এ কে খন্দকার
মুক্তিযুদ্ধের সেক্টর
মুক্তিযুদ্ধের সময় বাংলাদেশকে-১১টি সেক্টরে ভাগ করা হয়েছিলো।
নৌ-বাহিনীর অধীনে ছিল-১০ নং সেক্টর (সকল নদী ও বঙ্গোপসাগর)
১০ নং সেক্টরে কোনো সেক্টর কমান্ডার ছিল না
চট্টগ্রাম-১নং সেক্টর
ঢাক-২ নং সেক্টর
রাজশাহী-৭ নং সেক্টর
মুজিব নগর-৮ নং সেক্টর
সুন্দরবন-৯ নং সেক্টর
নিচে সংখ্যা ১১টি সেক্টরের অঞ্চল পরিচিতি দেয়া হলঃ
| ১নং সেক্টর | চট্টগ্রাম ও পাবর্ত্য চট্টগ্রাম | বীরশ্রেষ্ঠ মুন্সী আব্দুর রব |
| ২নং সেক্টর | ঢাকা, নোয়াখালী, ফরিদপুর ও কুমিল্লার অংশবিশেষ | |
| ৩নং সেক্টর | কুমিল্লা, কিশোরগঞ্জ ও হবিগঞ্জ | (বীরশ্রেষ্ঠ রুহুল আমিন প্রথমে এই সেক্টরে যুদ্ধ করেন) |
| ৪ নং সেক্টর | মৌলভীবাজার ও সিলেটের পূর্বাংশ | |
| ৫নং সেক্টর | সিলেট ও সুনামগঞ্জ | বীরশ্রেষ্ঠ হামিদুর রহমান |
| ৬নং সেক্টর | রংপুর (বিভাগ) | |
| ৭নং সেক্টর | রাজশাহী (বিভাগ) | বীরশ্রেষ্ঠ মহিউদ্দীন জাহাঙ্গীর |
| ৮নং সেক্টর | কুষ্টিয়া, যশোর থেকে খুলনা, সাতক্ষীরা | বীরশ্রেষ্ঠ মোস্তফা কামাল বীরশ্রেষ্ঠ নূর মোহাম্মদ শেখ |
| ৯নং সেক্টর | সুন্দরবন ও বরিশাল (বিভাগ) | |
| ১০নং সেক্টর | সকল নৌপথ ও সমুদ্র উপকূলীয় অঞ্চল | বীরশ্রেষ্ঠ নুরুল আমিন |
| ১১নং সেক্টর | ময়মনসিংহ | |
2.বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে ভারতের অবদান তুলে ধরো?
উত্তরঃ ভূমিকাঃ ১৯৭১ সালে একটি স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশকে প্রতিষ্ঠা করার ক্ষেত্রে একটি আঞ্চলিক শক্তি হিসেবে ভারত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে ভারতের অবদান রয়েছে। তবে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে ভারতের অবদান নিয়ে গবেষক ও রাজনীতিবিদদের মধ্যে দু ধরনের মতামত রয়েছে। একদল এতােই আবেগপ্রবণ যে, তারা কিছুতেই স্বীকার করতে চাননা, জাতীয় স্বার্থে ভারত মুক্তিযুদ্ধে সহায়তা করেছে। দ্বিতীয় একদল বলতে চান বাংলাদেশ প্রকৃতপক্ষে ভারতের সৃষ্টি। মুক্তিযুদ্ধে ভারতের উদ্দেশ্য যাই হােক না কেন তাদের মানবিক, সামরিক, আর্থিক, রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক ভূমিকা যে মুক্তিযুদ্ধকে ভূরান্বিত করেছে তা নিঃসন্দেহে বলা যায়। তবে ভারত রাজনৈতিক, ভৌগােলিক ও মতাদর্শগত কারণেই যে মুক্তিযুদ্ধে বাংলাদেশকে সহায়তা করেছিল একথাও উড়িয়ে দেওয়া যায় না। তাই মুক্তিযুদ্ধে ভারতের ভূমিকা একেবারে নিঃস্বার্থ না হয়ে মিশ্র ভূমিকায় রূপান্তরিত হয়। তা যুদ্ধে ভারতের ভূমিকা নিঃস্বার্থ ছিল কিনা ও আন্তর্জাতিক পররাষ্ট্রনীতিতে প্রতিটি রাষ্ট্রই জাতীয় স্বার্থকেই প্রথমে প্রাধান্য দেয় । ভারতও এক্ষেত্রে ব্যতিক্রম নয়। মুক্তিযুদ্ধ ভারতের কাছে পররাষ্ট্রনীতিরই একটি বিষয় ছিল ।ফলে ভারত সে দৃষ্টিকোণ থেকে যুদ্ধকে অনুধাবন করার চেষ্টা করেছে। নিম্নে যুদ্ধে ভারত নিঃস্বার্থ ছিল কিনা তা বিচার করা হল :
মুক্তিযুদ্ধে ভারতের অবদান
১. জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের সমর্থন দান
ভারতের বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধকে সমর্থন দান বিভিন্ন পর্যায়ে বিভিন্নরকম ছিল। প্রথম পর্যায়ে অর্থাৎ মার্চ মাসের শেষ থেকে এপ্রিল মাসের শেষ দিক পর্যন্ত সময়কালে ভারত বাংলাদেশের বিভিন্ন রাজনৈতিক, সামরিক ব্যক্তিকে আশ্রয়দানের সুযােগ দেয়। কলকাতায় একটি প্রবাসী সরকার গঠনের ব্যবস্থা করে। এছাড়া পূর্ব বাংলার স্বাধীনতার জন্য স্বল্প পরিমাণে সামরিক সহায়তা দিতে থাকে এবং মুক্তিযুদ্ধের অনুকূলে আন্তর্জাতিক সমর্থন পাওয়ার জন্য ভারত কূটনৈতিক তৎপরতা অব্যাহত রাখে। এভাবে ভারত বাংলাদেশের জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের প্রতি সমর্থন জ্ঞাপন করে ।
আরো পড়তে পারেনঃ- বাংলাদেশে মুক্তিযুদ্ধে নারীর অবদান আলােচনা কর।
২. জনসমর্থন ও সহযােগিতা প্রদান
ভারতের অধিকাংশ রাজনৈতিক দল, সংগঠন, বুদ্ধিজীবী, পেশাজীবী এবং জনগণ মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে আকুণ্ঠ সহানুভূতি প্রকাশ করে। সরকারি দল কংগ্রেস ছাড়াও কমিউনিস্ট পার্টি, সােস্যালিস্ট পার্টি, জাতিসংঘ মুক্তিযুদ্ধে সমর্থন জানায় মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে জনমত সংগঠন ও শরণার্থীদের আশ্রয়, খাদ্য দিয়ে, সহায়তা করে সর্বস্ত রের ভারতীয় জনগণ ও স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন। বুদ্ধিজীবীরা ‘শিল্পী সাহিত্যিক বুদ্ধিজীবী সমিতি’ গঠন করে অর্থ সংগ্রহ ছাড়াও জনমত সৃষ্টিতে অবদান রাখেন। পন্ডিত রবিশঙ্কর জনসমর্থন ও অর্থ আদায়ে সক্রিয় ভূমিকা পালন করেন। বিশেষ করে পশ্চিমবঙ্গের জনগন। বাংলাদেশ সেবা সংঘ’ স্বাধীন বাংলা সংগ্রাম সহায়ক সমিতি নামে বিভিন্ন সংগঠনের মাধ্যমে সহায়তার হাত বাড়িয়ে দেয়।
৩.শরণার্থীদের আশ্রয় প্রদান
প্রথম পর্যায়ে ভারত পাকিস্তানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘােষণার ব্যাপারে কিংবা বাংলাদেশকে সরাসরি সাহায্য দেয়ার ব্যাপারে ভারতের সরকারী মহল আগ্রহী ছিল না। এ পর্যায়ে ভারত সীমান্ত উন্মুক্ত করে দেয়,বাংলাদেশ সরকারকে অবাধে ভারতীয় এলাকায় রাজনৈতিক তৎপরতা চালানোর সুযােগ করে দেয়। এর ফলে মুক্তিযুদ্ধের সময় গড়ে ২০-৪৫ হাজার অসহায়, নিরস্ত্র মানুষ ভারতে আশ্রয় নেয়। মে মাসের প্রথম থেকে জুনের শেষ পর্যন্ত সময়কালে বাংলাদেশের প্রায় এক কোটি শরণার্থী ভারতে প্রবেশ করে। ভারত সরকার এই বিপুল শরণার্থীদের থাকা ও খাবারের বন্দোবস্ত করে মানবিক কাজ সম্পন্ন করে যা মুক্তিযুদ্ধের সময় খুবই প্রয়ােজনীয় বলে বিবেচিত হয়। ভারত সরকারের হিসেবে শরণার্থীদের পিছনে ভারতের খরচ হয় ৩৬৭ মিলিয়ন মার্কিন ডলার। ফলে শরণার্থীদের আশ্রয় প্রদান করেও মুক্তিযুদ্ধে ভারতের অবদান রয়েছে।
৪. মুক্তিযােদ্ধাদের ট্রেনিং প্রদান
এপ্রিলের শেষ নাগাদ বাঙালি যুবকদের সশস্ত্র ট্রেনিং দেয়া শুরু হয় ভারতের মাটিতে। এছাড়া ভারত এসময় হালকা অস্ত্র ও দেয়। RAW এর প্রত্যক্ষ তত্ত্বাবধানে গঠিত্ব হয় ‘মুজিব বাহিনী’ । জুনে এদের ট্রেনিং শুরু হয় এবং নভেম্বর পর্যন্ত চলে।এছাড়া অসংখ্য বেসামরিক লােককে ভারত সরকার প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করে। তারা প্রশিক্ষণ নিয়ে মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করে এবং বাংলাদেশের বিজয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে ।
৫. কূটনৈতিক সহযােগিতা
কূটনৈতিক দিক থেকেও মুক্তিযুদ্ধে ভারতের অবদান রয়েছে। জুন মাসের তৃতীয় সপ্তাহে মার্কিন প্রতিরক্ষা সচিব হেনরী কিসিঞ্চার ভারত সফর করে ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর সঙ্গে বৈঠকে মুক্তিযুদ্ধে ভারতীয় সহযােগিতা প্রত্যাহারের অনুরােধ করলে প্রত্যাখান করেন। এতে যুক্তরাষ্ট্রের সহায়তায় মধ্যস্থতার পথ রুদ্ধ হয় এবং এর ফলে ভারত তার নিজস্ব বিবেচনায় চলতে থাকে। জুলাই মাসে চীন ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে পাকিস্তান সহযােগিতায় পৌঁছালে সােভিয়েত ইউনিয়নের দিকে ঝুঁকে পড়ে ভারত। ৯ আগস্ট রুশ-ভারত মৈত্রী চুক্তি স্বাক্ষরিত হলে বাংলাদেশ সংক্রান্ত ভারতের নীতি ও কর্মসূচীর পরিবর্তন দেখা যায় । ইন্দিরা গান্ধী সেপ্টেম্বরে রাশিয়া সফর করলে মস্কো-দিল্লী চুক্তির আওতায় ভারতকে সহায়তার আশ্বাস দেয়া হয়। ফলে বাঙালি বিরােধী যেকোন আন্তর্জাতিক সমাধানের বিরুদ্ধে ভারত ও সােভিয়েত ইউনিয়ন তৎপর হয়ে উঠে।
আরো পড়তে পারেনঃ- মুক্তিযুদ্ধে ভারতের ভূমিকা আলােচনা কর।
৬. সামরিক অভিযান প্রেরণ
জুলাই মাস থেকে ভারতীয় বাহিনী পাকিস্তানের বিভিন্ন সামরিক ঘাঁটি নিয়মিত ধ্বংস করার কাজে আত্মনিয়ােগ করে।জুলাই থেকে নভেম্বর পর্যন্ত ভারত পূর্ব বাংলার সমস্যার প্রত্যাশিত সমাধানের জন্য কূটনৈতিক প্রচেষ্ঠার সাথে সামরিক প্রচেষ্টা জোরদার করে। ১৯৭১ সালের সেপ্টেম্বর মাসে ভারতীয় সেনাবাহিনীর একটি দল পূর্ব বাংলায় মােতায়েন করা হয়। ভারত কর্তৃক প্রেরিত তিনটি সৈন্যবহরের দুটি ছিল সপ্তম পদাতিক, একটি ছিল নবম পদাতিক যাদেরকে ভারত পূর্ব বাংলার সীমান্ত এলাকায় মােতায়েন করে। ২৩ নভেম্বর ইয়াহিয়া খান ১০ দিনের মধ্যে যুদ্ধ শুরুর ঘােমণা দিলে পাকিস্তানের সঙ্গে ভারতের যুদ্ধ অনিবার্য হয়ে ওঠে। ৩ ডিসেম্বর ভারতের বিমান ঘাটিতে পাকিস্তান বিমান হামলা চালালে চূড়ান্ত যুদ্ধ শুরু হয়। ভারত স্থল, নৌ ও বিমান পথে যুদ্ধ শুরু করে এবং বাংলাদেশ অভ্যন্তরে প্রবেশ করে। পাকিস্তান প্রতিটি ক্ষেত্রেই পরাজিত হয়। ভারতীয় মিত্র ও বাঙালি মুক্তিবাহিনী সম্মিলিতভাবে ১৫ ডিসেম্বর ঢাকা পৌছে। ১৬ ডিসেম্বর পাকিস্তানের আত্মসমর্পনের মধ্য দিয়ে সামরিক অভিযানের সমাপ্তি হয়।
৭. স্বাধীনতার স্বীকৃতি প্রদান
ভারতই প্রথম দেশ যারা মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন ১৯৭১ সালের ৬ ডিসেম্বর স্বাধীন সার্বভৌম দেশ হিসেবে বাংলাদেশকে স্বীকৃতি প্রদান করে। ফলে বাংলাদেশের স্বাধীনতার পক্ষে বিশ্বজনমত আরাে দৃঢ় হয়। ভারতকে অনুসরণ করে ৭ ডিসেম্বর ভুটান বাংলাদেশ স্বীকৃতি প্রদান করে। এভাবে ভারতের পদাঙ্ক অনুসরণ একে একে বিশ্বের অধিকাংশ দেশ, পরাশক্তি, বাংলাদেশকে স্বীকৃতি প্রদান করে। যার ফলে বিশ্বের দরবারে বাংলাদেশ স্বাধীন সার্বভৌম দেশ হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে। এক্ষেত্রে ভারতের ভূমিকা অগ্রগণ্য।
উপসংহারঃ পরিশেষে বলা যায় যে, মুক্তিযুদ্ধের নয় মাস শরণার্থীদের আশ্রয়, মুক্তিযােদ্ধাদের ট্রেনিং ও অস্ত্র দিয়ে, প্রবাসী সরকার গঠনে সহায়তা করে, আন্তর্জাতিক ফোরামে বাংলাদেশের পক্ষে জনমত গঠন করে, সর্বোপরি চূড়ান্ত পর্বে যুদ্ধে সরাসরি অংশ নিয়ে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে ভারতের অবদান গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। তবে এসবের পিছনে নিছক ভালােবাসা বা সহানুভূতির অনুভূতিই যে প্রধান ছিল একথা সত্যি নয়। এর পিছনে ভারতের জাতীয় স্বার্থের বিষয়টিও অনেক ক্ষেত্রে জড়িত ছিল, যা ভারতকে যুদ্ধে অংশগ্রহণ করতে ত্বরিত করেছিল। মােটকথা ভারত সরকারের নীতির কিছু স্বার্থবাদী দিক থাকলেও এগুলাে ছিল বৈদেশিক নীতিরই একটি অংশ। কেননা, একমাত্র দেশ ভারত যে প্রথম থেকে শেষ পর্যন্ত বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে ভূমিকা রেখেছে। তাই মুক্তিযুদ্ধে ভারতের অবদান ছিল তাৎপর্যপূর্ণ।
অধ্যায় 10
অতি সংক্ষিপ্ত প্রশ্নাবলী
বাংলাদেশের সংবিধান কত তারিখ থেকে কার্যকর হয়?
উত্তরঃ বাংলাদেশের সংবিধান কার্যকর হয় – ১৬ ডিসেম্বর ১৯৭২।
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের সংবিধান স্বাধীন ও সার্বভৌম বাংলাদেশ রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ আইন। এটি একটি লিখিত দলিল। ১৯৭২ খ্রিষ্টাব্দের ৪ঠা নভেম্বর তারিখে বাংলাদেশের জাতীয় সংসদে এই সংবিধান গৃহীত হয় এবং একই বছরের ১৬ ডিসেম্বর হতে এটি কার্যকর হয়। মূল সংবিধান ইংরেজি ভাষায় রচিত হয় এবং একে বাংলায় অনুবাদ করা হয়। তাই এটি বাংলা ও ইংরেজি উভয় ভাষায় বিদ্যমান। তবে ইংরেজি ও বাংলার মধ্যে অর্থগত বিরোধ দৃশ্যমান হলে বাংলা রূপ অনুসরণীয় হবে
বাকশাল এর পূর্ণরূপ কি?
উত্তরঃ বাকশাল এর পূর্ণ নাম বাংলাদেশ কৃষক শ্রমিক আওয়ামী লীগ। ১৯৭৫ সালের ২৫ জানুয়ারি শেখ মুজিবুর রহমান সংবিধানের চতুর্থ সংশোধনী উত্থাপন করেন। ... ১৯৭৫ সালের ২৪ ফেব্রুয়ারি রাষ্ট্রপতি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান অন্যান্য রাজনৈতিক দল ভেঙে দিয়ে 'বাংলাদেশ কৃষক শ্রমিক আওয়ামী লীগ' (বাকশাল) নামে জাতীয় রাজনৈতিক দল গঠন করেন। এটি একটি দলের নাম। ১৯৭৫ সালের জানুয়ারি মাসে এর জন্ম।
সংক্ষিপ্ত প্রশ্নাবলী
বঙ্গবন্ধু হত্যার কারণ কী ছিল?
উত্তরঃ
১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে নৃশংসভাবে হত্যা করা হয়। কী কারণে জাতির পিতাকে জীবন দিতে হয়েছে তা বঙ্গবন্ধুর আত্মস্বীকৃত খুনিরা পরবর্তীকালে স্বীকার করেছেন। শুধু এদেশীয় একপাক্ষিক চক্রান্তে বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করা হয়নি তা ইতিহাস ঘেঁটে পাওয়া যায়। একটি স্বৈরাচারী সামরিক জান্তার বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে স্বাধীন সার্বভৌম রাষ্ট্রের জন্ম দেওয়া নায়ককে বৈশ্বিক চক্রান্ত করে হত্যা করা হয়েছে। শুধু তাই নয়, একজন গণতান্ত্রিক বিশ্বনেতাকে তার পরিবারসহ হত্যার পেছনে উপমহাদেশের সাম্প্রদায়িকতা বড় ভূমিকা পালন করেছে। বঙ্গবন্ধু তার জীবনে এসবের বিরুদ্ধে দৃঢ় অবস্থানে ছিলেন। অপরদিকে বৈশি^ক রাজনীতিতে বঙ্গবন্ধু ছিলেন এক বড় নিয়ামক।
জাতির পিতা মারা যাওয়ার ঠিক ২ বছর আগে ১৯৭৩ সালের সেপ্টেম্বর মাস। জোট নিরপেক্ষ ৭৩ জাতি (ন্যাম) শীর্ষ সম্মেলন আলজেরিয়ার রাজধানী আলজিয়ার্সে। সদ্য জন্ম নেওয়া স্বাধীন রাষ্ট্রের প্রতিনিধি হিসেবে বঙ্গবন্ধু উপস্থিত। ভারতের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীসহ মিশরের আনোয়ার সাদাত, লিবিয়ার কর্নেল গাদ্দাফি, ফিলিস্তিনের ইয়াসির আরাফাত, সাবেক যুগোসøাভিয়ার মার্শাল টিটো, কিউবার ফিদেল ক্যাস্ত্রো ও সৌদি আরবের কিং ফয়সল সেখানে উপস্থিত। সম্মেলনের পর কয়েক বছরে বিভিন্ন মেয়াদে উপস্থিত এসব নেতাদের হত্যা করা হয়েছে।
১৯৭৫ সালে আগস্ট মাসে বঙ্গবন্ধু হত্যার পর ১৯৭৫ সালের জুলাই মাসে হত্যা করা হয় সৌদি আরবের কিং ফয়সলকে। তারপর শিখ বিচ্ছিন্নতাবাদীদের লেলিয়ে হত্যা করা হয় প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীকে, চরমপন্থী মুসলিম ব্রাদাহুড জঙ্গিদের দ্বারা হত্যা হন মিশরের আনোয়ার সাদাত, শরীরে স্লো পয়জন প্রবেশ করিয়ে হত্যা করা হয় ইয়াসির আরাফাতকে, সবশেষে হত্যা করা হয় লিবিয়ার গাদ্দাফিকে।
বিশ্বের এসব প্রভাবশালী নেতা হত্যার পেছনে রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতাও বৈশ্বিক কূটনৈতিক ইন্ধন ছিল বলে মনে করেন ইতিহাসবিদরা। আরবের কিং ফয়সলকে হত্যার কারণ তিনি মুসলমানদের আল-আকসা মসজিদ এক বছরের মধ্যে ইসরায়েলের দখলমুক্ত করতে চেয়েছিলেন। অপরদিকে ১৯৭২ সালের সংবিধান রচনা ও ৭১-এর পরাজয়ের প্রতিশোধ নিতে বিদেশিদের দালালরা হত্যা করে বঙ্গবন্ধুকে। পাকিস্তানপন্থি বাঙালিরা পাকিস্তানের মতো এক সাম্প্রদায়িক রাষ্ট্র চেয়েছিল কিন্তু তাতে সফল না হওয়ায় বঙ্গবন্ধুকেসপরিবারে জীবন দিতে হয়েছে।
পশ্চিমা শক্তি শুরু থেকেই এই জোটের বিপক্ষে অবস্থান নিয়েছিল। তারা চায় বিশ্ব নিজেরাই শাসন-শোষণ করবে। প্রভাবশালী দুই নেতা নেহেরু ও নাসেরের মৃত্যু হওয়ার পর জোটের হাল ধরেন প্রধানমন্ত্রীইন্দিরা গান্ধী। পশ্চিমা শক্তিকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে জোটকে এগিয়ে নিতে জোটের নেতৃত্বে আসেন ইন্দিরা গান্ধী, মার্শাল টিটো ও বঙ্গবন্ধু। পরবর্তীকালেইন্দিরা গান্ধী, বঙ্গবন্ধু হত্যা হয়। সেই সঙ্গে কিছুকাল পরে মারা যান মার্শাল টিটো। ভেঙে পড়ে ন্যাম। প্রকৃত ক্ষমতা চলে যায় পশ্চিমা বিশে^র কাছে। যেমনটি তারা চেয়েছিল। আর এ ন্যাম শীর্ষ সম্মেলনে ফিদেল ক্যাস্ত্রো বলেছিলেন, ‘আমি হিমালয় দেখিনি, কিন্তু শেখ মুজিবকে দেখেছি।’
উনিশ শতকের বিশ^ব্যাপী ভয়াল সাম্রাজ্যবাদের বিষবৃক্ষ আজ হৃষ্টপুষ্ট হয়েছে। সারা মধ্যপ্রাচ্যে বিস্তার করেছে পশ্চিমা সাম্রাজ্যবাদ। বঙ্গবন্ধুর শোষণমুক্ত সমাজ গঠনের যে দৃঢ় আকাক্সক্ষা ছিল তা তিনি স্বচক্ষে দেখে যেতে পারেননি। তার সাম্রাজ্যবাদবিরোধী ভূমিকা, ধর্মান্ধতা ও সাম্প্রায়িকতার বিরুদ্ধে আজীবন সংগ্রাম রচনার শেষ পৃষ্ঠা অধরাই থেকে গিয়েছে। তিনি বেঁচে থাকলে বিংশ শতাব্দীর নয়া আগ্রাসন থেকে মানুষকে শান্তির জন্য স্বাধীনতা রক্ষার জন্য আবারও জীবন বিলিয়ে দিতে উদ্বুদ্ধ করতেন নিশ্চিত।
বঙ্গবন্ধুর স্বদেশ প্রত্যাবর্তন সম্পর্কে টীকা লিখ
বাকশাল কি?
উত্তরঃ
আওয়ামী পন্থীরা বলবে সবাই এখন দল। আর বেশি জানা নাই। আওয়ামী বিরোধীরা বলবে গনতন্ত্র হত্যা, বাক স্বাধীনতা হরণ, স্বৈরতন্ত্র, রাজতন্ত্র আরও অনেক কিছু। যদিও শিশুটি ভূমিষ্ঠই হয় নি – সে অন্ধ বধির বোবা।
বঙ্গবন্ধু ১৯৭৫ সালের ২৬ যে মার্চ সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে দ্বিতীয় বিপ্লব ‘বাকশাল’ ঘোষণা করেছিলেন। বলেছিলেন – সিস্টেম পরিবর্তন করেছি মানুষের মুখে হাসি ফোটাবার জন্য, শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনার জন্য। রাজনৈতিক স্বাধীনতা ব্যর্থ হয়ে যায় যদি অর্থনৈতিক মুক্তি না আসে। এই ঘুণে ধরা ইংরেজ আমলের, পাকিস্তানি আমলের শাসন ব্যবস্থা চলতে পারে না। ঢেলে সাজাতে হবে। তাহলে দেশের মঙ্গল আসতে পারে। তিন বছর অপেক্ষা করেছি। দেখে শুনে আমি আমার স্থির বিশ্বাসে পৌঁছেছি। জনগণের কাছে পৌঁছাতে হবে শাসনতন্ত্রের মর্ম কথা।
কিশোরগঞ্জ সদরে বাকশাল সিস্টেমে পার্লামেন্ট নির্বাচন হয়েছিল। প্রয়াত শহীদ সৈয়দ নজরুল ইসলাম বাকশালের ভাইস প্রেসিডেন্ট হওয়ায় আসনটি শূন্য হয়। পার্টি থেকে মনোনয়ন দেয়া হয়েছিল – তাঁর ভাই সৈয়দ ওয়াহিদুল ইসলাম পট্টু মিয়া, আবদুস সাত্তার উকিল তৎকালীন জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি, আশরাফ উদ্দিন মাষ্টার ও মহিউদ্দিন আহমেদ তৎকালীন জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক। জনাব মহিউদ্দিন আহমেদ, পট্টু মিয়ার পক্ষে নিজেকে প্রত্যাহার করে নেন। সাত্তার উকিলের পক্ষে ছিলেন বর্তমান মহামান্য রাষ্ট্রপতি আব্দুল হামিদ। জনাব পট্টু মিয়ার পক্ষে সাভাবিক ভাবে শহীদ সৈয়দ নজরুল ইসলাম। কিন্তু নিরীহ জনাব আশরাফ মাষ্টার নিতান্তই একা। তৎকালীন কিশোরগঞ্জ-৪ আসনের সাংসদ বর্তমান মহামান্য রাষ্ট্রপতি আব্দুল হামিদ ফেয়ার ইলেকশন যাতে হয় – সে চেষ্টা করেছেন। প্রশাসনের সাথে যোগাযোগ রেখে অর্থ, মাসল ও পাওয়ার বিহীন আশরাফ মাষ্টার সেদিন জয়লাভ করেছিলেন। এই হচ্ছে বাকশালের নির্বাচন।
‘বঙ্গবন্ধুর কথায় একজন, দুইজন, তিনজনকে নমিনেশন দেয়া হবে। জনগণ বাছাই করবে কে ভাল কে মন্দ। আমরা চাই শোষিতের গণতন্ত্র, আমরা চাই না শোষকের গণতন্ত্র – এটা পরিষ্কার’।
বর্তমান নমিনেশন পদ্ধতিতে আশরাফ মাষ্টারের মনোনয়ন পাওয়ার সম্ভাবনা ছিল শূন্য। ভাল নেতা তৈরীর এটা আসল পদ্ধতি। ভাল মানুষেরা রাজনীতিতে আসতে উৎসাহী হবে। সবাই সৎভাবে ভাল কাজ করার চেষ্টা করবে। কর্মীরাও মুল্যায়িত হবে।আজকে কিশোরগঞ্জের মেয়র নমিনেশন যদি এভাবে হতো সবাই সুযোগ পেত। যোগ্যতা জনপ্রিয়তা দিয়ে বের হয়ে আসতো। দ্বন্দ সংঘাত কমে যেত। প্রশাসন ও নির্বাচন কমিশন নিরপেক্ষ থাকবে একমাত্র বাকশাল পদ্ধতিতে। তাদের কারোরই পক্ষ নেয়ার দরকার হবে না। কারণ দল তো একটা। দুর্নীতি দূর করতে হলে সৎ রাজনীতিবিদ দরকার। বঙ্গবন্ধু অর্থনৈতিক মুক্তির লক্ষ্যে মৃত্যুর ক‘মাস আগেই দুর্নীতির বিরুদ্ধে জেহাদ ঘোষণা করেছিলেন এবং বাকশাল সিস্টেম চালু করেছিলেন। বঙ্গবন্ধুর এই স্বপ্নকে বাস্তবায়নে চলুন জনমত তৈরি করি। মুজিববর্ষের অঙ্গীকার – বাকশাল দরকার। চলবে…
ডা: আ ন ম নৌশাদ খাঁন
অধ্যক্ষ
রাষ্ট্রপতি আব্দুল হামিদ মেডিকেল কলেজে
১৯৭১ সালের সংবিধানে প্রদত্ত মৌলিক অধিকার সমূহ আলোচনা কর?
উত্তরঃ বাংলাদেশের সংবিধানের তৃতীয় ভাগ "মৌলিক অধিকার" অনুসারে বাংলাদেশের নাগরিক হিসেবে প্রত্যেক বাংলাদেশী স্বতঃসিদ্ধভাবে কতিপয় মৌলিক অধিকারের মালিক।[১][২] তৃতীয় ভাগ "মৌলিক অধিকার"-এর শুরুতেই ২৬ নং অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, মৌলিক অধিকারের সঙ্গে অসামঞ্জস্যপূর্ণ কোনো আইন করা যাবে না।[১][২] আর যদি করা হয়, তবে তা স্বতঃসিদ্ধভাবে বাতিল হয়ে যাবে। এই অনুচ্ছেদ অনুসারে, মৌলিক অধিকারের পরিপন্থী পূর্বেকার সকল আইন সাংবিধানিকভাবে অবৈধ।[২] মৌলিক অধিকার শারীরিক ও মানসিক সীমানা সংকোচনকারী কৃত্রিম বাধা অতিক্রম করে মুক্তি ও ন্যায়বিচারের পরিবেশ নিশ্চিত করে নাগরিকদের জীবন মর্যাদাপূর্ণ করে।[২] স্বাধীন বিচারব্যবস্থা ও শক্তিশালী গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানসমূহ নাগরিক অধিকার লঙ্ঘনের বিরুদ্ধে সর্বোত্তম রক্ষাকবচ।[২] সংবিধানের চতুর্থ পরিচ্ছেদের ১০২ অনুচ্ছেদ সুপ্রিম কোর্টের হাইকোর্ট বিভাগকে মৌলিক অধিকার বলবৎ করার এখতিয়ার দিয়েছে।[২] বাংলাদেশের সংবিধান অনুসারে প্রত্যেক বাংলাদেশীর মৌলিক অধিকার ১৮টি।[৩]
পরিচ্ছেদসমূহ
o ১.৩সরকারী নিয়োগ-লাভে সুযোগের সমতা
o ১.৫জীবন ও ব্যক্তিস্বাধীনতার অধিকার
o ১.৬গ্রেপ্তার ও আটকে রক্ষাকবচ
o ১.৭জবরদস্তিমূলক শ্রম নিষিদ্ধ
o ১.৮বিচার ও দন্ড সম্পর্কে রক্ষণ
o ১.১২চিন্তা, বিবেক ও বাকস্বাধীনতা
o ১.১৩পেশা বা বৃত্তির স্বাধীনতা ধারা ৪০
o ১.১৪ধর্মীয় স্বাধীনতা ধারা ৪১
o ১.১৫সম্পত্তির অধিকার ধারা ৪২
o ১.১৭মৌলিক অধিকারবঞ্চিত হলে উচ্চ আদালতে রিট করার অধিকার
জনগণের মৌলিক অধিকারসমূহ[সম্পাদনা]
আইনের দৃষ্টিতে সমতা[সম্পাদনা]
সংবিধানের ২৭নং অনুচ্ছেদ অনুসারে, সকল নাগরিক আইনের দৃষ্টিতে সমান এবং আইনের সমান আশ্রয় লাভের অধিকারী।
বৈষম্য করা যাবে না[সম্পাদনা]
২৮নং অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে যে ধর্ম, বর্ণ, লিঙ্গ, বাসস্থান বা পেশাগত কারণে কোনো নাগরিকের প্রতি বৈষম্য করা যাবে না।
সরকারী নিয়োগ-লাভে সুযোগের সমতা[সম্পাদনা]
২৯নং অনুচ্ছেদ অনুসারে প্রজাতন্ত্রের কর্মে নিয়োগ বা পদ-লাভের ক্ষেত্রে সকল নাগরিকের জন্য সুযোগের সমতা থাকিবে।
আইনের আশ্রয়লাভের অধিকার[সম্পাদনা]
৩১নং অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে যে বাংলাদেশের প্রত্যেক নাগরিক যে কোন স্থানে অবস্থানরত অবস্থায় আইনের আশ্রয় লাভের অধিকার রাখে।
জীবন ও ব্যক্তিস্বাধীনতার অধিকার[সম্পাদনা]
৩২ নং অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, "আইনানুযায়ী ব্যতীত জীবন ও ব্যক্তি-স্বাধীনতা হইতে কোন ব্যক্তিকে বঞ্চিত করা যাইবে না।" এই অধিকার জাতিসংঘের মানবাধিকার-ঘোষণাপত্রে রয়েছে এবং এই অধিকারের ভিত্তিতে বিশ্বের বহু দেশে মৃত্যুদণ্ড নিষিদ্ধ করা হয়েছে।
গ্রেপ্তার ও আটকে রক্ষাকবচ[সম্পাদনা]
৩৩ নং অনুচ্ছেদে ঘোষিত হয়েছে যে, গ্রেপ্তারকৃত ব্যক্তিকে যথাসম্ভব দ্রুত গ্রেপ্তারের কারণ না জানিয়ে আটক রাখা যাবে না এবং উক্ত ব্যক্তিকে তার মনোনীত আইনজীবীর সাথে পরামর্শের ও তার দ্বারা আত্মপক্ষ সমর্থনের অধিকার হতে বঞ্চিত করা যাবে না। গ্রেপ্তারকৃত ও প্রহরায় আটক প্রত্যেক ব্যক্তিকে নিকটতম ম্যাজিস্ট্রেটের সম্মুখে গ্রেপ্তারের চব্বিশ ঘণ্টার মধ্যে (গ্রেপ্তারের স্থান হতে ম্যাজিস্ট্রেটের আদালতে আনয়নের জন্য প্রয়োজনীয় সময় ব্যতিরেকে) হাজির করা হবে এবং ম্যাজিস্ট্রেটের আদেশ ছাড়া তাকে এর চেয়ে বেশি সময় প্রহরায় আটক রাখা যাবে না।
জবরদস্তিমূলক শ্রম নিষিদ্ধ[সম্পাদনা]
৩৪ নং অনুচ্ছেদ অনুসারে, "সকল প্রকার জবরদস্তি-শ্রম নিষিদ্ধ; এবং এই বিধান কোনভাবে লংঘিত হইলে তাহা আইনতঃ দণ্ডনীয় অপরাধ বলিয়া গণ্য হইবে।"
বিচার ও দন্ড সম্পর্কে রক্ষণ[সম্পাদনা]
সংবিধানের ৩৫ নং অনুচ্ছেদ অনুসারে,
(১) অপরাধের দায়যুক্ত কার্যসংঘটনকালে বলবৎ ছিল, এইরূপ আইন ভঙ্গ করবার অপরাধ ছাড়া কোন ব্যক্তিকে দোষী সাব্যস্ত করা যাবে না এবং অপরাধ-সংঘটনকালে বলবৎ সেই আইনবলে যে দণ্ড দেওয়া যেত, তাকে তার অধিক বা তা হতে ভিন্ন দণ্ড দেওয়া যাবে না।
(২) এক অপরাধের জন্য কোন ব্যক্তিকে একাধিকবার ফৌজদারীতে সোপর্দ ও দণ্ডিত করা যাবে না।
(৩) ফৌজদারী অপরাধের দায়ে অভিযুক্ত প্রত্যেক ব্যক্তি আইনের দ্বারা প্রতিষ্ঠিত স্বাধীন ও নিরপেক্ষ আদালত বা ট্রাইব্যুনালে দ্রুত ও প্রকাশ্য বিচারলাভের অধিকারী হবেন।
(৪) কোন অপরাধের দায়ে অভিযুক্ত ব্যক্তিকে নিজের বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দিতে বাধ্য করা যাবে না।
(৫) কোন ব্যক্তিকে যন্ত্রণা দেওয়া যাবে না কিংবা নিষ্ঠুর, অমানুষিক বা লাঞ্ছনাকর দণ্ড দেওয়া যাবে না কিংবা কাহারও সহিত অনুরূপ ব্যবহার করা যাবে না।
(৬) প্রচলিত আইনে নির্দিষ্ট কোন দণ্ড বা বিচারপদ্ধতি সম্পর্কিত কোন বিধানের প্রয়োগকে এই অনুচ্ছেদের (৩) বা (৫) দফার কোন কিছুই প্রভাবিত করবে না।
চলাফেরার স্বাধীনতা[সম্পাদনা]
৩৬নং অনুচ্ছেদ অনুযায়ী আইন মোতাবেক বাংলাদেশের সর্বত্র অবাধ চলাফেরা, এর যে কোন স্থানে বসবাস ও বসতিস্থাপন এবং বাংলাদেশ ত্যাগ ও বাংলাদেশে পুনঃপ্রবেশ করবার অধিকার প্রত্যেক নাগরিকের থাকবে।
সমাবেশের স্বাধীনতা[সম্পাদনা]
৩৭নং অনুচ্ছেদ মোতাবেক, আইনসাপেক্ষে শান্তিপূর্ণভাবে ও নিরস্ত্র অবস্থায় সমবেত হবার এবং জনসভা ও শোভাযাত্রায় যোগদান করবার অধিকার প্রত্যেক নাগরিকের থাকবে।
সংগঠনের স্বাধীনতা[সম্পাদনা]
৩৮নং অনুচ্ছেদ বলে যে আইন সাপেক্ষে সমিতি বা সংঘ গঠন করবার অধিকার প্রত্যেক নাগরিকের থাকবে।
চিন্তা, বিবেক ও বাকস্বাধীনতা[সম্পাদনা]
৩৯ নং অনুচ্ছেদ অনুসারে বাংলাদেশের নাগরিকদের চিন্তা, বিবেক ও বাকস্বাধীনতার নিশ্চয়তা দিয়েছে। প্রত্যেক নাগরিকের বাক ও ভাব প্রকাশের স্বাধীনতার পাশাপাশি সংবাদপত্রের স্বাধীনতা দিয়েছে।
পেশা বা বৃত্তির স্বাধীনতা ধারা ৪০[সম্পাদনা]
আইন সাপেক্ষে "কোন পেশা বা বৃত্তি-গ্রহণের কিংবা কারবার বা ব্যবসায়-পরিচালনার জন্য আইনের দ্বারা কোন যোগ্যতা নির্ধারিত হইয়া থাকিলে অনুরূপ যোগ্যতাসম্পন্ন প্রত্যেক নাগরিকের যে কোন আইনসঙ্গত পেশা বা বৃত্তি-গ্রহণের এবং যে কোন আইনসঙ্গত কারবার বা ব্যবসায়-পরিচালনার অধিকার থাকিবে।"
ধর্মীয় স্বাধীনতা ধারা ৪১[সম্পাদনা]
"প্রত্যেক নাগরিকের যে কোন ধর্ম অবলম্বন, পালন বা প্রচারের অধিকার রহিয়াছে।"
সম্পত্তির অধিকার ধারা ৪২[সম্পাদনা]
"আইনের দ্বারা আরোপিত বাধানিষেধ-সাপেক্ষে প্রত্যেক নাগরিকের সম্পত্তি অর্জন, ধারণ, হস্তান্তর বা অন্যভাবে বিলি-ব্যবস্থা করিবার অধিকার থাকিবে এবং আইনের কর্তৃত্ব ব্যতীত কোন সম্পত্তি বাধ্যতামূলকভাবে গ্রহণ, রাষ্ট্রায়ত্ত বা দখল করা যাইবে না।"
গৃহ ও যোগাযোগের অধিকার[সম্পাদনা]
আইন সাপেক্ষে প্রত্যেক নাগরিকের প্রবেশ, তল্লাশী ও আটক হতে স্বীয় গৃহে নিরাপত্তালাভের অধিকার থাকবে এবং চিঠিপত্রের ও যোগাযোগের অন্যান্য উপায়ের গোপনতারক্ষার অধিকার থাকবে।
মৌলিক অধিকারবঞ্চিত হলে উচ্চ আদালতে রিট করার অধিকার[সম্পাদনা]
যদি কোনো কারণে মৌলিক অধিকার থেকে কেউ বঞ্চিত হয়, তাহলে এ ক্ষেত্রে সংক্ষুব্ধ ব্যক্তি সংবিধানের ১০২ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী হাইকোর্ট বিভাগে রিট আবেদন করার অধিকার রয়েছে।
তথ্যসূত্র
যুদ্ধবিধ্বস্ত বাংলাদেশ পুনর্গঠনে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান কর্তৃক গৃহীত পদক্ষেপ সমূহ আলোচনা কর?
উত্তরঃ ১৯৭২ সালে প্রধান কাণ্ডারি হিসেবে যুদ্ধবিধ্বস্ত একটি দেশকে বঙ্গবন্ধু কীভাবে সুষ্ঠুভাবে পুনর্গঠন করেছিলেন, তার সেই ঐতিহাসিক ভূমিকা স্মরণ করব। এটি স্মরণ করব এজন্য যে, আমাদের অনেকেই তার গুরুত্বপূর্ণ অবদান এবং গণতন্ত্র ও প্রতিষ্ঠান তৈরিতে তার দৃঢ় অঙ্গীকারের কথা ভুলে গেছেন।
বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবর রহমান পাকিস্তানের বন্দিদশা থেকে মুক্তি পান ১৯৭২ সালের প্রথম সপ্তাহে এবং অবশেষে অনবদ্য সংবর্ধনার মাধ্যমে সদ্য স্বাধীন দেশের রাজধানী ঢাকায় প্রত্যাবর্তন করেন একই বছরের ১০ জানুয়ারি। পথে তিনি যাত্রাবিরতি দেন লন্ডন ও নয়াদিল্লি।
একজন সম্মোহনী নেতা এবং জাতীয়তাবাদ, ধর্মনিরপেক্ষতা ও সমাজতন্ত্রে বিশ্বাসী বঙ্গবন্ধু ব্যাপক ত্যাগ স্বীকার করেছেন বাংলাদেশের স্বাধীনতার জন্য, নয়াদিল্লির পালাম বিমানবন্দরে নতুন দেশ নিয়ে তার ভিশনের কথা বলেছেন ১৯৭২ সালের ১০ জানুয়ারি। বাংলাদেশকে মুক্ত করার যাত্রাকে তিনি সেদিন বর্ণনা করেন ‘বন্দিদশা থেকে স্বাধীনতা, নিরাশা থেকে আশার’ যাত্রা হিসেবে। সেদিন আরো বলেন, তিনি স্বাধীন দেশে ফিরছেন হূদয়ে কারো প্রতি কোনো ঘৃণা নিয়ে নয়। বরং তিনি ফিরছেন পরম সন্তুষ্টি নিয়ে যে অবশেষে মিথ্যার বিপরীতে সত্য, উন্মত্ততার বিপরীতে সুবিবেচনা, কাপুরুষতার বিপরীতে সাহস, অন্যায়ের বিপরীতে ন্যায় এবং মন্দের বিপরীতে ভালোর জয় হয়েছে।
একজন রাষ্ট্রনায়ক, অবিশ্বাস্য বাগ্মী বঙ্গবন্ধু খুব স্বাভাবিকভাবেই প্রথমবারের মতো স্বাধীন বাংলাদেশের মাটিতে পা রেখেই আবেগে বিপুলভাবে অভিভূত হয়েছিলেন। সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে ১০ জানুয়ারি দেয়া ভাষণে তিনি খুব দক্ষতার সঙ্গে বাস্তবভিত্তিক পদক্ষেপের কথা বলেন এবং বাংলাদেশের বিজয়ী জনগণের উদ্দেশে গুরুত্বপূর্ণ পরামর্শ দেন। প্রথম সুযোগেই তিনি কাউকে অবাঙালিদের ওপর হাত না তুলতে সতর্ক করেন। একই সঙ্গে পাকিস্তানে আটকা পড়া চার লাখ বাঙালির নিরাপত্তার বিষয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেন। সাধারণ পাকিস্তানিদের প্রতি তার কোনো বিদ্বেষ নেই, সেটা যেমন নিশ্চিত করেছেন, তেমনি পরিষ্কার করে বলেছেন, অন্যায়ভাবে বাঙালিদের যারা হত্যা করেছে তাদের অবশ্যই বিচারের মুখোমুখি হতে হবে।
একই ভাষণের গুরুত্বপূর্ণ এক বিবৃতিতে মুসলিম বিশ্বের উদ্দেশে তিনি বলেছেন, কেবল ইন্দোনেশিয়ার পরেই বাংলাদেশ বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম মুসলিম রাষ্ট্র (বাংলাদেশে ইসলামের প্রতি বিশ্বাস বিপন্ন—পাকিস্তানিদের এমন প্রচারণার জবাবে তিনি এটা বলেছেন)। তাদের মনোযোগ আকর্ষণ করে তিনি আরো বলেছেন, ‘ইসলামের নামে এ দেশে পাকিস্তানি সেনাবাহিনী মুসলমানদের মেরেছে, অসম্মান করেছে নারীদের। আমি ইসলামকে অসম্মান করতে দিতে চাই না।’ তিনি তদন্তের জন্য একটি আন্তর্জাতিক ট্রাইব্যুনাল গঠন এবং পাকিস্তানি সেনাবাহিনী কর্তৃক বাংলাদেশে চালানো গণহত্যার পরিসর নির্ধারণের আহ্বানও জানান জাতিসংঘকে।
উপরোক্ত মতামতগুলো আন্তঃসম্পর্কিত এবং সেসবে কেবল যুদ্ধাপরাধের বিচারের ব্যাপারে তার দৃঢ় অঙ্গীকারই প্রকাশ পায়নি, উপরন্তু প্রকাশ পেয়েছে ইসলামী প্রজাতন্ত্র পাকিস্তান কর্তৃক ইসলামের অপব্যবহারের বিষয়টিও। এই একই দৃষ্টিভঙ্গিই তাকে পরিচালিত করেছিল ১৯৭২ সালের ১০ ফেব্রুয়ারিতে ওআইসির ভূমিকায় ক্ষোভ প্রকাশ করতে। তখনকার ওআইসির মহাসচিব টেঙ্কু আবদুর রহমানকে তিনি বলেছিলেন, দ্বিতীয় মুসলিম দেশ হওয়া সত্ত্বেও (১৯৭১ সালে) নয় মাসে পশ্চিম পাকিস্তানি সামরিক বাহিনী ঠাণ্ডা মাথায় তিন লাখ নিরপরাধ মুসলিম ও অন্য সম্প্রদায় খুন করলে তার বিরুদ্ধে ওআইসি কোনো প্রতিবাদ করেনি। ওআইসি মহাসচিব এর পাল্টা জবাব হিসেবে পরে বাংলাদেশে বসবাসরত বিহারি ও অন্য অবাঙালি মুসলিমদের প্রতি বাঙালিদের আচরণে ক্ষুব্ধভাবে উদ্বেগ জানিয়েছিলেন।
পরবর্তীতে পাকিস্তান দখলদার বাহিনী এবং তাদের সহযোগী কর্তৃক সংঘটিত অপরাধের তদন্ত সম্পন্ন হওয়ার পর ১৯৭৩ সালের ১৭ এপ্রিল গণহত্যা, যুদ্ধাপরাধ, জেনেভা কনভেনশনের ৩ নং ধারা লঙ্ঘন, খুন, ধর্ষণ, অগ্নিসংযোগ প্রভৃতি মানবতাবিরোধী অপরাধে ১৯৫ জনকে বিচারের আওতায় আনার সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। আরো সিদ্ধান্ত নেয়া হয়, এসব ব্যক্তি ও অপরাধ সংঘটনের পরিকল্পনা ও বাস্তবায়নে জড়িত অন্য সহযোগীদের বিচার আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত বিচারিক রীতি অনুযায়ী সম্পন্ন করা হবে। এ যুক্তি এবং সংশ্লিষ্ট বিচারিক প্রক্রিয়া ১৯৭৫ সালের নৃশংস আগস্ট হত্যাকাণ্ডের আগে পর্যন্ত বঙ্গবন্ধুর কেন্দ্রীয় বিষয় ছিল। দুর্ভাগ্যক্রমে, বঙ্গবন্ধুর মৃত্যু পুরো বিচারিক প্রক্রিয়াটিকে লক্ষ্যচ্যুত করে। তবে এখন সৌভাগ্য যে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে মানবতাবিরোধী যুদ্ধাপরাধের বিচার প্রক্রিয়া কার্যকর হয়েছে এবং এখন সেটি প্রায় শেষ হতে চলেছে। আমরা এজন্য আজীবন ঋণী থাকব লাখ লাখ মানুষের কাছে, যারা নিজেদের পরিবার হারিয়েছেন এবং ১০ হাজার নারী, যারা নিগ্রহের শিকার হয়েছিলেন।
পরবর্তীতে দৃঢ় অবস্থান সত্ত্বেও ১৯৭৩ সালের মিসর-ইসরায়েল যুদ্ধের সময় বঙ্গবন্ধু ইসলাম, আরব দেশ এবং ওআইসিকে সমর্থনে বাংলাদেশের ঘনিষ্ঠতা দেখাতে দ্বিধা করেননি। তার ব্যক্তিগত উদ্যোগেই তখন মিসর ও সিরিয়ায় বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর চিকিৎসক দল ও চায়ের কার্টুন পাঠানো হয়েছিল। ওআইসির সদস্য রাষ্ট্র কর্তৃক এটা ব্যাপকভাবে প্রশংসিত হয়েছিল এবং এরই ধারাবাহিকতায় ১৯৭৪ সালের ফেব্রুয়ারিতে লাহোরে অনুষ্ঠিত শীর্ষ সম্মেলনে সংস্থাটির পক্ষ থেকে বাংলাদেশকে সদস্য হওয়ার আমন্ত্রণ জানানো হয়।
১৯৭৫ সালের পর অনেক নিন্দুকই বঙ্গবন্ধু ও আওয়ামী লীগকে ভারতের সঙ্গে সম্পর্কের ক্ষেত্রে বাংলাদেশের স্বার্থ জলাঞ্জলি দিয়েছে বলে চিত্রায়িত করার চেষ্টা করেছে। এটা আসলে সত্য থেকে অনেক দূরে।
১৯৭২ সালের ৯ জানুয়ারি (বঙ্গবন্ধুর ঢাকা প্রত্যাবর্তনের আগের দিন) নয়াদিল্লিতে দেয়া যৌথ বিবৃতি এবং বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্দুস সামাদের পরবর্তী সফরে তিনি আমাদের স্বাধীনতা সংগ্রামে ভারতের ভূমিকার জন্য ধন্যবাদ জানান। একই সঙ্গে এ ব্যাপারেও তিনি জোর দেন যে বাংলাদেশ সরকার যখনই ইচ্ছা পোষণ করবে তখনই যেন এ দেশের ভূখণ্ড থেকে মুক্তিযুদ্ধের কাজে মুক্তিবাহিনীতে যোগদানকারী ভারতীয় সামরিক বাহিনীর সদস্যরা চলে যায়। এই প্রতিজ্ঞা পরবর্তীতে কঠোরভাবে অনুসরণ করা হয়। ঢাকা ফিরে বঙ্গবন্ধু সহযোগিতার জন্য ভারতকে প্রকাশ্যে ধন্যবাদ জানান এবং তারপর বাংলাদেশ থেকে সব ভারতীয় সৈন্য প্রত্যাহারের অনুরোধ জানান। এটা তাত্ক্ষণিকভাবে পরিপালিত হয় এবং এর মধ্য দিয়ে বাংলাদেশ ভারতের উপনিবেশ হতে যাচ্ছে—পাকিস্তানি নেতৃত্বের এমন অপপ্রচারেরও অবসান হয়।
বঙ্গবন্ধু ও তার সরকারের অন্য গুরুত্বপূর্ণ অর্জন হলো, বিধ্বস্ত দেশের যুদ্ধাক্রান্ত নাগরিক এবং ভারতের সীমান্তে আশ্রয় চাওয়া ১০ মিলিয়নের অধিক শরণার্থীর মধ্যে আস্থা সৃষ্টি করা। ১৯৭২ সালের ৮ ফেব্রুয়ারি ভারতের প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী কলকাতায় বলেছেন, ছয় সপ্তাহের স্বল্প সময়ে সাত মিলিয়নের অধিক শরণার্থীকে ভারত থেকে বাংলাদেশে ফিরে আসতে হবে। যথারীতি সেটা করা হয়েছে। পাকিস্তানি সেনাবাহিনী কর্তৃক হাজার হাজার নির্যাতনের শিকার হওয়া মানুষগুলো সেখান থেকে দেশে ফিরে এসেছে। তাদের নতুন জীবন শুরু হয়েছে। এ রকম বিপুল জনসংখ্যার ত্রাণ ও পুনর্বাসন নিঃসন্দেহে দুঃসাহসিক কাজ। তবে জাতিসংঘের সহযোগিতায় এই দুঃসাহসিক কাজই দক্ষতার সঙ্গে মোকাবেলা করেছেন বঙ্গবন্ধু ও তার দল।
সব জাতির সার্বভৌম সাম্যে গভীরভাবে বিশ্বাস করতেন বঙ্গবন্ধু। এ প্রসঙ্গে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ইন্ডিয়া ডেস্কের পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে আমি সাম্য ও পারস্পরিক সুফলের ভিত্তিতে উন্নয়ন ও বাণিজ্যের ক্ষেত্রে ঘনিষ্ঠ সহযোগিতা বৃদ্ধিতে তার অব্যাহত চাপের বিষয়টি প্রত্যক্ষভাবে দেখেছি। তিনি আরো বিশ্বাস করতেন পারস্পরিক সহযোগিতার ওপর। তিনি জোর দিতেন এ অঞ্চলের মানুষের উপকার সাধনে উন্নয়ন ও সম্পদের সদ্ব্যবহারের ওপর। এ অ্যাপ্রোচই তাকে অবশেষে পরিচালিত করেছিল বিশেষজ্ঞদের নিয়ে স্থায়ীভাবে একটি যৌথ নদী কমিশন গঠনে ভারতকে রাজি করাতে। এর উদ্দেশ্য ছিল দুই দেশের অভিন্ন নদী সম্পর্কে একটি ব্যাপকভিত্তিক জরিপ করে বন্যা নিয়ন্ত্রণ ও অন্যান্য ক্ষেত্রে উভয় দেশের কল্যাণে প্রকল্প তৈরি করা। ১৯৭২ সালের ১৯ মার্চ ঢাকায় বাংলাদেশ ও ভারতের প্রধানমন্ত্রীর যৌথ ঘোষণায়ও ভারতের সংলগ্ন এলাকায় পাওয়ার গ্রিড সংযোগের সমীক্ষা করার কথা বলা হয়েছিল। বঙ্গবন্ধুর সেই স্বপ্ন এখনো অর্জিত হয়নি। আজকে ৪৪ বছর পর আমাদের আঞ্চলিক জ্বালানি গ্রিড ও দক্ষিণ এশিয়ায় আঞ্চলিক পানি ব্যবস্থাপনার প্রয়োজনীয় ডিনামিক্স আবর্তিত হচ্ছে। এ রকম প্রক্রিয়া অনেক বছর আগে বঙ্গবন্ধুর ভিশনের সঙ্গে সংগতিপূর্ণ।
সুনির্দিষ্টভাবে পররাষ্ট্রনীতিতে বঙ্গবন্ধুর গভীর আগ্রহ ছিল। তিনি পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে কেবল বাংলাদেশের প্রতি অন্য দেশের স্বীকৃতি আদায় ও কূটনৈতিক সম্পর্ক তৈরি নয়, উপরন্তু বাংলাদেশকে গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক সংগঠনগুলোয় সদস্য হিসেবে অন্তর্ভুক্তকরণে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নিতে উৎসাহিত করতেন। তার নিজের বিদেশ সফর বা তার পররাষ্ট্রমন্ত্রীর বিদেশ সফরের প্রতিটি সুযোগে নির্দেশনা থাকত বাংলাদেশ যেন প্রত্যেকের সঙ্গে ভ্রাতৃত্ব ও ভালো প্রতিবেশীসুলভ সম্পর্ক রাখে। তিনি জোটনিরপেক্ষ, শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান, পারস্পরিক সহযোগিতা, কারো অভ্যন্তরীণ ব্যাপারে হস্তক্ষেপ না করা এবং ভূখণ্ডগত অখণ্ডতা ও সার্বভৌমত্বের প্রতি শ্রদ্ধার মতো মৌলিক নীতির ওপর বেশি জোর দিতেন।
বঙ্গবন্ধুর এই দৃঢ় প্রচেষ্টাই আমাদের খুব দ্রুতই আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে এগিয়ে নিতে সাহায্য করেছে। ১৯৭২ সালের ২৬ মার্চ আমরা যখন স্বাধীনতার প্রথম বার্ষিকী উদযাপন করছি, তখন দেখা গেল এরই মধ্যে ৫৪টি দেশ আমাদের স্বীকৃতি দিয়েছে। ১৯৭২ সালের শেষের দিকে এই সংখ্যা দ্রুত বাড়তে লাগল। আমি মনে করি, এটা ব্যাপকভাবে সম্ভব হয়েছে বঙ্গবন্ধু কর্তৃক নেয়া ইতিবাচক উদ্যোগের ফলে। এক্ষেত্রে অবশ্য বাংলাদেশের ভূখণ্ড থেকে ভারতকে তাদের সৈন্য প্রত্যাহারে রাজি করানোর বিষয়টিও কাজ করেছে। এরপর অল্প সময়ের মধ্যে বাংলাদেশ জোটনিরপেক্ষ গ্রুপ, কমনওয়েলথ, আইএলও ও ডব্লিউএইচওর সদস্য হয়েছে এবং কূটনৈতিক ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
এখানে এটা উল্লেখ করা প্রয়োজন, জাতিসংঘের সদস্য রাষ্ট্র না হয়েও বঙ্গবন্ধু বাংলাদেশের জন্য তত্কালীন মহাসচিব কুর্ট ওয়েলদেইমের কাছে মানবিক সহযোগিতা চেয়েছিলেন। ১৯৭২ সালের ২৭ নভেম্বর ওয়েলদেইমের কাছে পাকিস্তানের বিভিন্ন ক্যাম্পে বন্দি বাংলাদেশের নিরপরাধ মানুষকে পুনর্বাসনে সহযোগিতা প্রত্যাশা করেছিলেন। তিনি এটা করেছেন এজন্য যে পাকিস্তানিরা বিষয়টিকে রাজনীতিকীকরণ এবং বাংলাদেশের মুক্তিবাহিনী ও মিত্রবাহিনীর হাতে আত্মসমপর্ণ করা পাকিস্তানি বাহিনীর মুক্তির বিষয়টি যুক্ত করতে চেয়েছিল। তার দিক থেকে এ উদ্বেগ দেশের মানুষের প্রতি তার ভালোবাসারই বহিঃপ্রকাশ।
বাঙালির মূলনীতি, প্রথা-রীতি, জাতীয়তাবাদসহ বাংলাদেশের সমৃদ্ধ সাংস্কৃতিক ও সাহিত্যিক ঐতিহ্যের প্রতিও তিনি দৃঢ় বিশ্বাসী ছিলেন। সোনার বাংলায় বাঙালি হিসেবে বাস করা ছিল তার গর্বের বিষয়। তিনি ছিলেন দেশের জন্য জীবন উৎসর্গকারী। আমরা চিরঋণী থেকে তার স্মৃতি জাগরূক রাখার চেষ্টা করব এবং একই সঙ্গে আমাদের সর্বোচ্চ ত্যাগের মাধ্যমে উন্নত বাংলাদেশ গঠনে তার স্বপ্ন বাস্তবে রূপ দেয়ার চেষ্টা করব, যেখানে সব নাগরিকের জন্য সমসুযোগ ও আইনের শাসন নিশ্চিত হবে।
Degree 1st Year Political Science Suggestion 2021
Political Science 1st Paper Suggestion 2021
রাষ্ট্রবিজ্ঞান ১ম পত্র সাজেশন
ডিগ্রী ১ম বর্ষ পরীক্ষার্থীদের জন্য।
অধ্যায় এক
অতি সংক্ষিপ্ত প্রশ্নাবলী
রাষ্ট্রবিজ্ঞানের জনক কে
Polis শব্দের অর্থ কি
রাষ্ট্রবিজ্ঞান কি বিজ্ঞান নাকি কলা
হবস লক রুশো কোন যুগের দার্শনিক
রাষ্ট্রবিজ্ঞান হল সর্বশ্রেষ্ঠ বিজ্ঞান উক্তিটি কার
ক্ষমতার স্বতন্ত্রীকরণমতবাদের প্রবক্তা কে
সংক্ষিপ্ত প্রশ্নাবলী
রাষ্ট্রবিজ্ঞানের সংজ্ঞা দাও
রচনামূলক প্রশ্নাবলী
রাষ্ট্রবিজ্ঞান পাঠের গুরুত্ব ও প্রয়োজনীয়তাআলোচনা করো
অধ্যায় 2
অতি সংক্ষিপ্ত প্রশ্নাবলী
রাষ্ট্র শব্দটি কে সর্বপ্রথম ব্যবহার করেন
সরকারের অঙ্গ কয়টি
রাষ্ট্র একটি ক্ষতিকর অথচ প্রয়োজনীয়প্রতিষ্ঠান এটি কাদের উক্তি
সামাজিক চুক্তি মতবাদের প্রবক্তা কারা
সংক্ষিপ্ত প্রশ্নাবলী
রাষ্ট্রের সংজ্ঞা দাও
রাষ্ট্র ও সরকারের মধ্যে কি সম্পর্ক
কল্যাণমূলক রাষ্ট্রের কয়েকটি বৈশিষ্ট্য বর্ণনা করো
রচনামূলক প্রশ্নাবলী
রাষ্ট্র কি রাষ্ট্রের উপাদান গুলো আলোচনা কর
রাষ্ট্রের উৎপত্তি সংক্রান্ত বিবর্তনমূলক মতবাদ টি বিশ্লেষণ করো
অধ্যায় 3
অতি সংক্ষিপ্ত প্রশ্নাবলী
সার্বভৌমত্বের অর্থ কি
সার্বভৌমত্বের বহুত্ববাদী প্রবক্তা কে
সার্বভৌমত্ব হলো রাষ্ট্রের চূড়ান্ত ইচ্ছা এটি কার উক্তি
দা স্পিরিট অফ লজ গ্রন্থটি রচয়িতা কে
আইনের উৎস গুলো কি কি
ব্রিটেন এর আইন সভার নাম কি
On Liberty কে লিখেছেন
স্বাধীনতার রক্ষাকবচ এর দুটি নাম লিখ
Demos শব্দটির অর্থ কি
বাংলাদেশের আইনসভার নাম কি
সাম্য ব্যতীত স্বাধীনতা অর্থহীন কে বলেছেন
ভোটাধিকার কোন ধরনের অধিকার
জাতীয়তা এর ইংরেজি প্রতিশব্দ কি
সংক্ষিপ্ত প্রশ্নাবলী
সার্বভৌমত্ব কি
আইনের সংজ্ঞা দাও
স্বাধীনতা ও সাম্যের মধ্যে সম্পর্ক লিখ
অধিকার ও কর্তব্যের মধ্যে সম্পর্ক আলোচনা করো
রচনামূলক প্রশ্নাবলী
আইনের সংজ্ঞা দাও আইনের উৎস সমূহ কি কি
জাতীয়তাবাদ আধুনিক সভ্যতার জন্য হুমকিস্বরূপ– ব্যাখ্যা করো
অধ্যায় 4
অতি সংক্ষিপ্ত প্রশ্নাবলী
প্লেটোর দুটি গ্রন্থের নাম লেখ
প্লেটোর মতে প্রাথমিক শিক্ষার বয়স কত
প্লেটোর দর্শনের মূল ভিত্তি কি
প্লেটোর আদর্শ রাষ্ট্র কোন ধরনের প্রতিষ্ঠান
অ্যারিস্টোটল স্থাপিত শিক্ষা প্রতিষ্ঠান নাম কি
দ্য পলিটিক্স গ্রন্থটি কার রচিত
দ্য সিটি অফ গড এর রচয়িতা কে
দুই তরবারি তত্ত্বের জনক কে
মধ্যযুগের অ্যারিস্টোটলবলা হয় কাকে
একুইনাসের ঐশ্বরিক আইন কি
দ্য প্রিন্স গ্রন্থটির লেখক কে
আধুনিক রাষ্ট্রচিন্তারজনক কে
রেনেসাঁর অর্থ কি
টমাস হবসের বিখ্যাত বইটির নাম লিখ
আধুনিক গণতন্ত্রের জনক কে
রুশোর লেখা বিখ্যাত গ্রন্থের নাম কি
সাধারণ ইচ্ছা তত্ত্ব টি কার
সংক্ষিপ্ত প্রশ্নাবলী
প্লেটোর সাম্যবাদ কি
প্লেটোর আদর্শ রাষ্ট্র কি
অ্যারিস্টোটলের নাগরিকত্ব তত্ত্বটি কি
অ্যারিস্টোটলের সরকারের শ্রেণীবিভাগ আলোচনা করো
মানব প্রকৃতি সম্পর্কে হবস এর ধারণা সংক্ষেপে আলোচনা করো
রচনামূলক প্রশ্নাবলী
রিপাবলিক এ বর্ণিত প্লেটোর আদর্শ রাষ্ট্রের বৈশিষ্ট্য সমূহ আলোচনা কর
ধর্ম, নৈতিকতা ও রাজনীতি সম্পর্কে ম্যাকিয়াভেলির ধারণা আলোচনা করো
ম্যাকিয়াভেলীকে আধুনিক রাষ্ট্রবিজ্ঞানের জনক বলা হয় কেন
Political Science 2nd Paper Suggestion 2021
অধ্যায় ১
অতি সংক্ষিপ্ত প্রশ্নাবলী
সংবিধানের দুটি উৎসের নাম লিখ
কোন দেশে পৃথিবীর সর্ববৃহৎ লিখিত সংবিধান বিদ্যমান?
সংবিধান প্রতিষ্ঠার পদ্ধতি কয়টি ও কি কি
পৃথিবীর সবচেয়ে ক্ষুত্রতম লিখিত সংবিধান কোনটি?
সংক্ষিপ্ত প্রশ্নাবলী
সংবিধান বলতে কি বুঝ?
উত্তম সংবিধানের বৈশিষ্ট্যগুলো কি কি?
রচনামূলক প্রশ্নাবলী
সাংবিধানিক সরকারে বৈশিষ্ট্যাবলী আলোচনা কর?
উত্তরঃ

No comments